ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের উত্তরখানে যুবলীগের গোপন বৈঠক, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৮ বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে ছেলের জন্মদিনে একফ্রেমে রাজ-শুভশ্রী বিয়ের আনন্দ রূপ নিল বিষাদে, সড়কে ঝরল ৪ প্রাণ ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা, ৯ জনের প্রাণহানি সুইডেনে সংসদ নির্বাচন: কট্টর ডানপন্থীদের সরকারে আসার জোর সম্ভাবনা

নেতানিয়াহুকে রক্ষায় মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র:

আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও কৌঁসুলির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৯ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১১:২২ এএম

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) শীর্ষ কর্তাদের ওপর ফের খড়্গহস্ত হলো যুক্তরাষ্ট্র। সংস্থাটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং একজন জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলির ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিশেষ ঘোষণায় এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। মূলত, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ মার্কিন মিত্রদের আইসিসির বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষার জন্যই এই আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।


যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐকান্তিক উদ্যোগে আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বহু দেশ এই আদালতের সদস্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এর সদস্যপদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও জাপানি বংশোদ্ভূত বিচারক তোমোকো আকানে এবং আদালতটির ‘সিনিয়র ট্রায়াল লয়ার’ বা জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি সেনেগালের নাগরিক আবদুলায়ে সেয়ের ওপর এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত বছর আইসিসির বিরুদ্ধে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন। মূলত সেই আদেশের আইনি কাঠামোর আওতাতেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো।


নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা তুলে ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “যেসব স্বাধীন দেশের সরকার আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি দেয়নি, সেসব দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অযাচিত তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, তাদের গ্রেপ্তার বা আটক করা কিংবা বিচারের আওতায় আনার মতো আইসিসির বেআইনি প্রচেষ্টায় এই ব্যক্তিরা (আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি) সরাসরিভাবে জড়িত রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব নাগরিক এবং মিত্রদের সুরক্ষায় সর্বদা বদ্ধপরিকর।”


তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর এমন একপাক্ষিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে আইনের শাসনকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। বিবৃতিতে আইসিসি আরও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেছে, “আইন প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কারণে যখন বিচারিক কাজে যুক্ত থাকা ব্যক্তিরা পরাশক্তিদের হুমকির সম্মুখীন হন, তখন মূলত গোটা বিশ্বের আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলাই এক চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।”

জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার শিকার সেনেগালের নাগরিক আবদুলায়ে সেয়ে আইসিসির সেই কৌঁসুলি দলের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ সদস্য, যাঁরা গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছিলেন। এ ছাড়া, আইসিসির আগামী মেয়াদের বিচারক হিসেবে নির্বাচনের জন্যও তিনি মনোনীত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই মার্কিন তৎপরতা খোদ ইউরোপে তাদের পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোর সঙ্গেও একধরনের গভীর কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি করেছে। আদালতের স্বাগতিক দেশ নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নেদারল্যান্ডস তাদের স্পষ্ট অসম্মতি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের ধারাবাহিক সমর্থনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি আইসিসি প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলেও জানান। টম বেরেন্ডসেন আরও লেখেন, আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোর সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের ম্যান্ডেট বা আইনি দায়িত্ব পালন করার অবাধ সুযোগ থাকা উচিত।


এর আগে, আইসিসির শীর্ষ বিচারক তোমোকো আকানে গত ডিসেম্বরেই বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা সব ধরনের পরিস্থিতি ও সংবেদনশীল মামলায় আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে দ্রুত স্থবির করে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত এর অস্তিত্বকেই চরমভাবে বিপন্ন করে তুলবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে অতীতের একটি তদন্ত এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার উদ্যোগেই মূলত ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর জের ধরেই গত বছর আদালতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা, কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপর পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন।

নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সব ধরনের সম্পদ পুরোপুরি জব্দ করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সব ধরনের লেনদেন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত প্রায় সব বৈশ্বিক ব্যাংকের সঙ্গেই মার্কিন ব্যবস্থার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তাই বিশ্বজুড়ে এই ব্যক্তিরা বড় ধরনের আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বেন। নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) গতকাল একটি সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করেছে। এর আওতায় তোমোকো আকানে এবং আবদুলায়ে সেয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলমান বৈধ লেনদেনগুলো গুটিয়ে নিতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চলতি বছরের জুনে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আইসিসির তিন সাহসী বিচারক। তাঁরা মার্কিন এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে দাবি করেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দুটি আলাদা মামলায় বলেছে, বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নৃশংসতার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইসিসির সঙ্গে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা তাদের সাংবিধানিক অধিকারের চরম পরিপন্থী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর যুক্তি হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা, মাদক বহনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক নৌযানে অভিযান পরিচালনাকারী দল এবং অন্যান্য মার্কিন সামরিক সদস্যদের জন্য আইসিসি এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কো রুবিও গত মাসে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, আইসিসির কার্যক্রম ব্যাহত করতে মার্কিন প্রশাসন তাদের চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও জোরদার করবে। এর অংশ হিসেবে অন্য দেশগুলোকে এই আন্তর্জাতিক সংস্থা ত্যাগ করতে রাজি করানোর জন্য একটি বড় পরিসরের কূটনৈতিক প্রচারণাও চালানো হবে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আইসিসি ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে এসব যুক্তির আড়ালে ট্রাম্প নিজেই একবার পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে, এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য কেবল নিজেদের বিচার থেকে বাঁচানো নয়, বরং ইসরায়েলি মিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্যান্যদের আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা থেকে পুরোপুরি রক্ষা করা।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এই আদালতের সদস্য রাষ্ট্র ছিল না। কোনো সদস্যরাষ্ট্র যখন নিজের দেশে ঘটে যাওয়া কোনো নৃশংসতার বিচার করতে অসমর্থ বা রাজনৈতিকভাবে অনিচ্ছুক হয়, শুধু তখনই আইসিসি সেখানে মানবতা রক্ষায় নিজের এখতিয়ার খাটায়। তবে আইসিসির সংবিধিতে এ-ও স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে যদি সদস্য নয় এমন কোনো দেশের নাগরিকও জঘন্য ও নৃশংস অপরাধ করেন, তবে তাঁর বিচার করার পূর্ণ আইনি ক্ষমতা এই আদালতের রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স


এ সম্পর্কিত আরো খবর