নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে এক চরম হৃদয়বিদারক পরিবেশ। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বন্যার পানির পাশাপাশি কাদার প্রবল স্রোতে নিমিষেই ভেসে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। এই দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ৬৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ কেশভ প্রসাদ বারাল এক আকুল অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। বন্যায় গুরুতর আহত হয়ে একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করেন।
কেশভ প্রসাদ জানান, বন্যার পানি বাড়িতে ঢোকার আগে তা দ্রুত ওপরের দিকে উঠছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একপর্যায়ে কাদা ও পাথরের এক বিশাল স্রোত তাঁদের বসতবাড়ির দিকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসে। তিনি চরম বিপদের মুখে নিজের স্ত্রীকে আঁকড়ে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কাদার বিধ্বংসী ও প্রবল স্রোতের কাছে তিনি পরাস্ত হন; চোখের সামনেই তাঁর হাত ছিটকে স্ত্রী ভেসে যান। মুহূর্তের মধ্যে সেই ঘন কাদার স্তূপ তাঁদের দোতলা বাড়ির ওপরের তলা পর্যন্ত উঠে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে সেই ভয়াল পরিস্থিতি।
বিপর্যয়ের প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর নেপালি সেনাবাহিনীর একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং মুমূর্ষু অবস্থায় কেশভ প্রসাদকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে কাদার গভীর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা তাঁর স্ত্রীকে আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী আর বেঁচে নেই এবং তিনি কাদার নিচেই কোথাও চাপা পড়ে আছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি সূত্রে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির কথা জানা গেছে।
এদিকে গত বুধবার নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে হঠাৎ শুরু হওয়া আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৭ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপাল পুলিশের স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার তথ্যমতে, দুর্গম এলাকাগুলো থেকে এ পর্যন্ত ১৫৭টি কঙ্কালসার ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে জরুরি সেবা দল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত মরদেহের মধ্যে রসুয়া জেলায় ১ জন, নুয়াকোটে ১১ জন, ধাদিংয়ে ১৮ জন, চিতওয়ানে ৩৩ জন, গোর্খায় ১৯ জন, তানাহুঁতে ৭ জন এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
দুর্যোগে নিহতের পাশাপাশি নিখোঁজের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০৩ জন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজদের একটি বড় অংশই রসুয়া ও বাগমাতি প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণরত বিদেশি পর্যটক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে নিখোঁজদের সন্ধানে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বন্যাকবলিত স্থানে আটকে পড়া শত শত মানুষকে উদ্ধার করতে ও নিরাপদে সরিয়ে নিতে কাজ করছেন উদ্ধারকারী দল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্লাবিত ও কাদা জমে থাকা এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। (তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স)