নেপালের উত্তরাঞ্চলে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ভয়াবহ ও আকস্মিক বন্যার জন্য মূল দায়ী ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—তিন দেশের অনিয়ন্ত্রিত কার্বন দূষণ। প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এমনটাই মনে করছে কাঠমান্ডু প্রশাসন। পরিবেশগত এই বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির জন্য বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী এই তিন দেশের কাছেই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চায় নেপাল। বিষয়টি আর কেবল নীতিগত আলোচনা বা ভাবনাচিন্তার স্তরে সীমাবদ্ধ নেই। চলতি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপন করতে পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল নেপালি টেলিভিশন চ্যানেল ‘কান্তিপুর টিভি’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র— এই তিন দেশ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন করে থাকে। তাদের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের প্রভাবে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নেপালসহ গোটা বিশ্বের ওপর। তাই পরিবেশগত বৈষম্যের বিচারে এই তিন দেশের কাছ থেকেই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিয়ে দুর্যোগ-পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে কাঠমান্ডু প্রশাসন।
ক্ষতিপূরণের দাবিটিকে কোনো দয়াদাক্ষিণ্য নয়, বরং সরাসরি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করছে নেপাল সরকার। এই বিষয়ে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য, “আমরা কারও কাছে কোনো সহানুভূতি বা সাহায্য চাইছি না, আমরা সরাসরি ন্যায়বিচার এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছি। সেই অনুযায়ী আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।” একই সঙ্গে কঠোর অবস্থান জানিয়ে তিনি আরও সংযোজন করেন, “এটা কোনো ভিক্ষা বা দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়। পরিবেশগত চরম ক্ষয়ক্ষতি পূরণে এটি বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর নৈতিক এবং আইনি দায়বদ্ধতা।”
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী ও আকস্মিক বন্যার পর দেশের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাবও প্রস্তুত করে নিয়েছে নেপাল সরকার। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্লাবিত ও বিধ্বস্ত নেপালের পুনর্গঠন ও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে দরকার অন্তত ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিদ্যমান সংকটে জাতিসংঘের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে দেশটির সরকার। তারা চাইছে, জলবায়ুজনিত হঠাৎ বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলানোর জন্য জাতিসংঘের যে সুনির্দিষ্ট বিশেষ তহবিল রয়েছে, সেখান থেকে জরুরি ভিত্তিতে এই আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হোক। তবে নেপালের তরফে বারবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, মানবিকতার খাতিরে কোনো সাধারণ অনুদান নয়, তারা নীতিগত ক্ষতিপূরণই আদায় করবে। নেপালের মূল দাবি হলো, বিশ্বজুড়ে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে প্রথম সারিতে থাকা প্রভাবশালী দেশগুলোকেই এই আর্থিক ক্ষতিপূরণের দায়ভার বহন করতে হবে।
পরিবেশগত এই অবিচারের বিষয়টি নিয়ে বৈশ্বিক দরবারে সমস্ত দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ভাষণ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ, যিনি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘বালেন’ নামে সমধিক পরিচিত। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৮১তম সাধারণ সভা আয়োজিত হতে যাচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে নেপালের প্রতিনিধি হিসেবে সেই ঐতিহ্যবাহী অধিবেশনে সশরীরে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থির হয়েছিল যে অধিবেশনে নেপালের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল; তবে নিজেদের পরিবেশগত দাবিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও জোরালো ও শক্তিশালী করতে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই জাতিসংঘে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর সোমবার নেপালের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মহেশ্বর ধাকাল পাহাড়ি অঞ্চলের এই দুর্যোগের জন্য পরোক্ষভাবে বিশ্বের ধনী দেশগুলোকেই দায়ী করেছিলেন। তার মতে, গত সপ্তাহে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে যে প্রলয়ঙ্করী হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। নেপালের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভাগের প্রধান স্পষ্ট করে বলেন, শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলো গত কয়েক দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করেছে, তার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে নেপালের মতো ভৌগোলিক দিক থেকে দুর্বল ও পাহাড়ি দেশগুলোকে। তার মতে, “যারা বৈশ্বিক বায়ুদূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে তারাই আজ সবচেয়ে বেশি খেসারত দিচ্ছে।”
তবে সেই সময় নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম সরাসরি প্রকাশ করেননি মহেশ্বর ধাকাল। তবে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট তিন পরাশক্তির নাম উন্মোচন করেছে কাঠমান্ডু। ঘটনাচক্রে যার মধ্যে দুটি দেশই হলো নেপালের প্রত্যক্ষ প্রতিবেশী—যাদের ওপর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা বিষয়ে সরাসরি নির্ভরশীল কাঠমান্ডু প্রশাসন।
এদিকে গত ২৬ আগস্টের প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানের পর থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত সর্বমোট ১,১২৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এখনও উদ্ধারকর্মীদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপাল পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ৪,৮৫৮ জন মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যার ফলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বহুলাংশে বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।