বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালির নাম পরিবর্তন করে নিজের নামে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই নতুন ও পরিবর্তিত নামের একটি মানচিত্রের ছবি ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউস। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে এই ঘটনা নতুন করে চরম চাঞ্চল্য ও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নিজের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা এক বার্তায় অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “এখন যেহেতু এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাহলে কি হরমুজ প্রণালির নাম বদলে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ রাখা উচিত? আমেরিকার মতোই, এটিও আগের চেয়ে আরও ‘উষ্ণ’ হয়ে উঠবে!” ট্রাম্পের এই বিতর্কিত ও আকস্মিক বার্তাটি প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার ঝড় উঠেছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সংযুক্তকারী আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি সমগ্র বিশ্বের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য জলপথগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিদিন এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাহিত ও পরিবহণ হয়ে থাকে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই জলপথটির গুরুত্ব অপরিসীম।
ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক সীমানার বিচারে কৌশলগত এই প্রণালিটি প্রধানত ইরানের ভূখণ্ডে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক ও সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে কখনোই বড় ধরনের কোনো সামরিক বা প্রশাসনিক বাধা কিংবা সমস্যা দেখা দেয়নি। বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই পথটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সবসময় সচেষ্ট ছিল।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের চরম পরিস্থিতিতে ইরান সরকার ঘোষণা দেয় যে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে যাতায়াত করতে ইচ্ছুক যেকোনো বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টোল বা মাশুল প্রদান করতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো ইরানের এই টোল আদায়ের সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সর্বাত্মক অবরোধের কারণে কোনো দেশি বা বিদেশি জাহাজ ইরানের কোনো বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না এবং একইভাবে বন্দর থেকে বাইরে বের হতেও পারছে না। ফলে পুরো অঞ্চলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিমণ্ডল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান সংঘাতের মাঝে এক ধরণের ‘অনানুষ্ঠানিক বিরতি’ বিরাজ করছিল। তবে সেই থমথমে পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে গত রোববার থেকে ফের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা নতুন করে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বাহিনীগুলোর মধ্যে। আর এই নতুন সংঘাতের প্রধান সূতপাত ঘটেছিল যখন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশ সৌদি আরবের দু’টি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ অত্যন্ত গোপনে এই হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। সেই সময় জাহাজ দুটির ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে, যা পুরো অঞ্চলকে আবার যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
মার্কিন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবশ্য বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও ভৌগোলিক জলপথ বা প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাম পরিবর্তনের প্রতি এক বিশেষ ধরনের দীর্ঘদিনের ঝোঁক ও আগ্রহ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ গ্রহণের অত্যন্ত অল্প কিছুদিন পরই তিনি মেক্সিকো উপসাগরের ঐতিহাসিক নাম পরিবর্তন করে একক সিদ্ধান্তে ‘আমেরিকা উপসাগর’ হিসেবে নামকরণ করেছিলেন।
সেই ধারা বজায় রেখে পরবর্তীতে গত বছরের জুলাই মাসে তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যকে কানাডার অন্টারিও রাজ্য থেকে ভৌগোলিকভাবে পৃথককারী বিখ্যাত হ্রদ ‘অন্টারিও হ্রদ’-এর নাম পরিবর্তন করেন। ঐতিহাসিক সেই হ্রদের নাম বদলে তিনি রেখেছিলেন ‘আমেরিকা হ্রদ’। ঐতিহাসিক জলাশয়ের নাম পরিবর্তনের সেই নিজস্ব তালিকার ধারাবাহিকতায় এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্ত করলেন বিশ্বের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও রণকৌশলগত জলপথ ‘ট্রাম্প প্রণালি’কে।
সূত্র: এএফপি/এনডিটিভি