ইউরোপের দেশ ইতালির মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা, হেনস্তা ও শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সময় সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে হামলায় জড়িত বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে।
হামলার ঘটনার সময় প্রচারিত ভিডিওতে একদল ব্যক্তিকে চিৎকার-চেঁচামেচি করে অশালীন আচরণ করতে দেখা যায়। আক্রমণকারীরা উচ্চস্বরে বলতে থাকে, ‘এই যে জুলাই জঙ্গি, যিনি দেশের বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে—এই যে দেখতে পাচ্ছেন, ভেনিসে আসছে। আমরা ভেনিস ছাত্রলীগ...এই ডিম আনো, ডিম আনো। বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করছে। আমরা এই দেশদ্রোহী জঙ্গিকে গোসল করিয়ে দিয়েছি। এই জুলাই যোদ্ধা বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করছে। সাজানো-গোছানো বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করছেন। জুলাই জঙ্গি আমাদের মাঝে আসছে।’
সে সময় পরিবারের সঙ্গে থাকা শিশুদের কথা বিবেচনা করে একজন আর্তনাদ করে চিৎকার করে বলেন, ‘বাচ্চা আছে আমার। কী করছেন এগুলো?’ কিন্তু তাতেও হামলাকারীরা থামেনি। অপর পাশ থেকে তাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি করা হয়। হামলাকারীদের মধ্যে একজনকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘আমরা ইতালির ছাত্রলীগ। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে যাবে, তাদের আমরা প্রতিহত করব।’
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে এক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তিনি জানান, ইতালির মেস্ত্রের একটি পার্কে ছোট ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে গেলে কতিপয় ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাঁর গায়ে জোরপূর্বক ড্রিংকস ও ডিম ছোড়া হয়, হাত থেকে মুঠোফোন ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়।
পুরো হামলার ঘটনাটি সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘লাইভ’ করছিলেন মনিরুল হাওলাদার নামের এক ব্যক্তি। লাইভের বিবরণীতে লেখা ছিল, ‘জুলাই জঙ্গি আজমেরী হক বাঁধনকে আমরা উত্তম মাধ্যম দিয়েছি ভেনিসে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ইতালি শাখা।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনিরুল হাওলাদারের গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলায়। তিনি মাদারীপুরের একটি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশ ছেড়ে প্রথমে লিবিয়া ও পরবর্তী সময়ে ইতালিতে গিয়ে আশ্রয় নেন।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে হামলায় অংশ নেওয়া আরও তিনজনের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ভিডিওতে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অভিনেত্রীর ওপর বারবার পানি ছুড়ছিলেন যে ব্যক্তি, তাঁর নাম শিপল মাহমুদ বিপ্লব। তাঁর বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে ইতালির ভেনিস শাখা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে জড়িত।
অন্যদিকে, ভিডিওর একপর্যায়ে অভিনেত্রী বাঁধনের দিকে তেড়ে গিয়ে তাঁকে থাপ্পড় দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায় ইলিয়াস মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা এই ইলিয়াস ইতালির ভেনিস শাখা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিতেন। ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে অভিনেত্রীর হাতে আঘাত লাগলে তাঁর মুঠোফোনটি হাত থেকে নিচে পড়ে ভেঙে যায়।
এছাড়া ভিডিওতে সামনের সারিতে থেকে অভিনেত্রীকে বারবার শাসাতে এবং আক্রমণাত্মক কথা বলতে দেখা গেছে আলতাফ পাহাড় নামের অন্য এক ব্যক্তিকে। শরীয়তপুরের বাসিন্দা আলতাফ পূর্বে ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে ইতালির ভেনিসে যুবলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।