ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করার মাধ্যমে বিশ্ব কূটনীতিতে এক নতুন এবং অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ভারত। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার তীব্র বিরোধের মধ্যেও একটি সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণা এনে বড় কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছিল দিল্লি। তবে তিন বছর পর এবারের ব্রিকস সম্মেলনে সেই সাফল্য ধরে রাখা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'ইন্ডিয়া টুডে'-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শীর্ষ সম্মেলনে একদিকে সশরীরে অংশ নিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অন্যদিকে এতে অংশ নিচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের শীর্ষ প্রতিনিধিরা।
এই বৃহৎ কূটনৈতিক আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও সম্মেলনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর ওয়াশিংটনের কড়া নজর ও প্রভাব বজায় থাকবে। ট্রাম্প প্রশাসন ব্রিকসকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। ফলে একদিকে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা—এই দ্বিবিধ চ্যালেঞ্জ সামলাতে হচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক মহলকে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব ব্রিকস সম্মেলনে চরম জটিলতা তৈরি করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানি সামরিক তৎপরতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট সংকট সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রবল নিরাপত্তাহীনতার মুখে ফেলেছে। এ অবস্থায় ব্রিকসের মঞ্চে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চাইবেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক হামলার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিতে। পক্ষান্তরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চাইবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রক্সি হামলার বিরুদ্ধে জোরালো বার্তা দিতে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রধান তিন দেশের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কমিয়ে এনে একটি গ্রহণযোগ্য যৌথ ঘোষণা তৈরি করতে রাশিয়া ও মিসরের সাথে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দিল্লি।
ভারতের জন্য সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বমঞ্চে নেওয়া কিছু কূটনৈতিক অবস্থান। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে 'বিশকেক ঘোষণা'-য় সই করেছিল ভারত, যেখানে ইরানের ওপর হামলার সরাসরি নিন্দা জানানো হয়েছিল। কিন্তু ব্রিকসের সভাপতি হিসেবে ভারত কোনোভাবেই চাইবে না যে, এই সম্মেলন থেকে এমন কোনো প্রস্তাব বা বার্তা তৈরি হোক যা ভারতকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড় করায় বা ব্রিকসকে কেবল একটি 'পশ্চিমবিরোধী জোট' হিসেবে চিহ্নিত করে।
ইন্ডিয়া টুডের এক গোলটেবিল বৈঠকে ভারতের সাবেক শীর্ষ প্রতিনিধি অমিতাভ কান্ত স্পষ্ট করেছেন যে, ব্রিকসের সভাপতি হিসেবে ভারতকে অত্যন্ত পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। ব্রিকস যেন কোনোভাবেই পশ্চিমবিরোধী আস্তানা হিসেবে চিত্রিত না হয়, সে বিষয়টি সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সাথে মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাক্স উল্লেখ করেছেন, ব্রিকসের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুসংহত করা, পশ্চিমের সাথে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত নয়। এছাড়া ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির প্রেক্ষাপটে ভারত ইতোমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ডলারের বিপরীতে নতুন কোনো ব্রিকস মুদ্রা তৈরির পক্ষে নয়, বরং সদস্য দেশগুলোর নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণেই মনোযোগী।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সাথে নিজস্ব ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে চলা ভারতের জন্য ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনটি সর্বকালের অন্যতম বড় পরীক্ষা। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াত আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, ভারত অতীতে বহু জটিল সম্মেলন সফলভাবে পরিচালনা করেছে। ভারতের কূটনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতায় এবারও এমন একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা সম্ভব হবে, যা সদস্য দেশগুলোর স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করবে এবং একই সাথে বৈশ্বিক ভারসাম্যের রাজনীতিতে দিল্লির অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে। (সংবাদ সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)