ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর সরকারের মেকআপ ও চুল সাজানোর অস্বাভাবিক সরকারি ব্যয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের দেশ-বিদেশের নানা সরকারি কাজে চুল সাজানো, মেকআপ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিত্বমূলক খাতে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে দেশটির সরকার। সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনে করা একটি আবেদনের জবাবে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসব বিস্তারিত তথ্যাদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডব্লিউআইওএন-এর এক প্রতিবেদনে এই বিপুল খরচের চমকপ্রদ সব উপাত্ত তুলে ধরা হয়।
প্রকাশিত নথিপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আইনজীবী ইয়ারা উইঙ্কলার-শালিত তথ্য অধিকার আইনের আওতায় এই সংক্রান্ত হিসাব প্রকাশের আবেদন জানান। সরকারের দেওয়া সরকারি তথ্যানুযায়ী, প্রকাশিত মোট ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রূপচর্চা ও প্রতিনিধিত্বের পেছনে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা অফিশিয়াল নথির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তথ্যাদি অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হেয়ারস্টাইলিস্ট ও মেকআপ শিল্পীদের নাম সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয়। তথ্যের স্বচ্ছতা না রেখে এসব ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখার কারণ হিসেবে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দেওয়া হয়েছে।
তথ্য অধিকার আইনের অধীনে প্রকাশিত মাসভিত্তিক খরচের সারণিতে আরও বেশ কিছু অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাব পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার চরম উত্তপ্ত ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের এ খাতের রাজকীয় ব্যয় বন্ধ হয়নি, বরং নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল। তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কেবল চুল সাজানোর পেছনে খরচ করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ ডলার এবং মেকআপের পেছনে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৮০ ডলার। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের চরম সংঘাতের মুহূর্তে কেবল অক্টোবর মাসেই প্রধানমন্ত্রীর চুল সাজানোর জন্য সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়েছে ৮১০ ডলার।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন মেয়াদের সরকারের শাসনকালের মধ্যে বছরভিত্তিক খরচের একটি স্পষ্ট ও বিরাট পার্থক্যের চিত্রও ফুটে উঠেছে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীদের চুল ও মেকআপ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ডলারে। কিন্তু এর ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের যৌথ শাসনামলে এ খাতে মোট ব্যয় হয়েছিল মাত্র ২৭ হাজার ৬০০ ডলার। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে এই খরচের পরিমাণ আগের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ডলারে গিয়ে উন্নীত হয়। এই ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ খরচ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক সফরের সময়ে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রীর চুল ও মেকআপ খাতে সর্বমোট ১৩ হাজার ৫০০ ডলার ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আয়োজিত আরেকটি ওয়াশিংটন সফরে একই বাবদ রাজকোষ থেকে ১১ হাজার ৫০০ ডলার ব্যয় করা হয়েছে।
চুল ও মেকআপের পাশাপাশি বিলাসবহুল পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সম্মানিত অতিথিদের আপ্যায়নসহ সরকারি প্রতিনিধিত্ব ভাত্তার আলাদা হিসাবও অফিশিয়াল নথিতে উন্মোচন করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আমলে প্রতিনিধিত্ব খাতে সর্বমোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ডলার ব্যয় করা হয়েছে। এর বিপরীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের সময় এই খরচ ছিল ১৯ হাজার ডলার এবং ইয়ার লাপিদের মেয়াদে তা ছিল মাত্র ২ হাজার ৬০০ ডলার। তবে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের গয়না, দামি পোশাক কিংবা ইমেজ কনসালট্যান্টদের পেছনে মোট কত খরচ হয়েছে, সে সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনো উন্মুক্ত করেনি ইসরায়েল সরকার। মুভমেন্ট ফর ফ্রিডম অব ইনফরমেশন নামের সংস্থাটি এই সমস্ত অপ্রকাশিত তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশের জোর দাবি জানিয়েছে।