‘ডিপ স্টেট’ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—সেই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার এমন বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তার কথায়, প্রস্তাবটি কখন, কী শর্তে দেওয়া হয়েছিল এবং ‘ডিপ স্টেট’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়, তবে বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আসিফ মাহমুদ, যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক এবং বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র, শুক্রবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, “ডিপ স্টেটে বৈদেশিকসহ একাধিক পক্ষ যুক্ত ছিল। তাই আমি কারও নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই না।”
তিনি আরও জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এই তথ্য দিয়েছেন। সেখানে আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা যখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন—যাদের আসলে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়—ওই সময়ে আমাদের কাছে একটি প্রস্তাব এনেছিল। তারা বলেছিল, আপনারা শেখ হাসিনা সরকারের বর্তমান মেয়াদ, অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব।”
ডিপ স্টেটের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত শর্তের মধ্যে ছিল, নির্দিষ্ট কিছু স্থানে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। এছাড়া তারা পুরো রোডম্যাপও প্রস্তুত করে এনেছিল। রোডম্যাপ অনুযায়ী, বিএনপির কিছু নেতার সাজা ছিল, যা আদালতের মাধ্যমে দীর্ঘায়িত করা যেত। এমনকি সাবেক এমপি তারেক রহমানের নামেও সাজা ছিল। যদি তিনি সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকতেন, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তিনি অংশ নিতে পারতেন না। এই শর্তগুলো নিশ্চিত করলে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৯ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারত।
কিন্তু আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, সরকার সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। “আমরা সবসময় গণতন্ত্রকে সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট ছিল। তাই নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করতে আমরা পদত্যাগ করে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছি।”
প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন-চার-পাঁচ মাসের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনায় ডিপ স্টেট তাদের কিছু স্বার্থ রক্ষা করলে তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখতে আগ্রহী ছিল। প্রস্তাবটি সরকারকে অ্যাপ্রোচ করা হয়েছিল, সম্ভবত অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছিল।
এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ওই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল আওয়ামী লীগের শাসনের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়ও। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা গ্রহণ করেনি। সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল যে তারা নির্বাচন দেবেই। ফলে ডিপ স্টেটের সঙ্গে সমঝোতায় তারা যাননি।
ডিপ স্টেট বলতে সাধারণত সরকারের বাইরে থেকেও রাষ্ট্রের নীতি ও ক্ষমতার ওপর প্রভাব খাটাতে সক্ষম প্রভাবশালী গোষ্ঠী বোঝানো হয়। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নয়, বরং রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত একটি ধারণা। আসিফ মাহমুদের বক্তব্য নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এনেছে।
প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকারের আর কোনো উপদেষ্টা এই প্রস্তাব বা ডিপ স্টেটের কথা উল্লেখ করেননি। তবে এনসিপির আহ্বায়ক এবং সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ১০ মার্চ রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিল ডিপ স্টেট’। তিনি স্পষ্ট করে কারা ডিপ স্টেট তা উল্লেখ করেননি।
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, “ডিপ স্টেটের প্রস্তাবে আমাদের কিছু স্থানে সহযোগিতা করার শর্ত ছিল। তারা আদালতের ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, সাজা দীর্ঘায়িত করা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রণের কৌশলও সাজিয়ে এনেছিল। কিন্তু আমরা গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।”
তিনি উল্লেখ করেন, ডিপ স্টেটের প্রস্তাব সরকারের প্রথম কয়েক মাসে এসেছে। প্রস্তাবটি অনেক বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জড়িয়ে ছিল। সরকার তা গ্রহণ না করে নিজস্ব রোডম্যাপ অনুসরণ করেছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার নিজের পদত্যাগে এগিয়েছে।
আসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবের শর্তগুলোর মধ্যে ছিল:
তিনি বলেন, “আমরা কখনও সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিইনি। আমরা সবসময় গণতন্ত্রকেই অগ্রাধিকার দিয়েছি।”
এ বিষয়ে আসিফ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচন স্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ না করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা পদত্যাগ করেছি যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীরা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে ভোট দিতে পারে।”
ডিপ স্টেটের পরিচয় ও কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে আসিফের বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।