জাতীয়তাবাদী
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছালেও তা হঠাৎ স্থগিত
হয়ে পড়েছে। মেয়াদের শেষভাগে এসে বিদায়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সংগঠনের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক
নাছির উদ্দীন। সামাজিকভাবে বিদায়ী বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের কাছে।
ধারণা
করা হচ্ছিল, বিদায়ী দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠকের পরপরই ছাত্রদলের নতুন কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। কিন্তু সেই বৈঠকের পর প্রায় এক
মাস পার হয়ে গেলেও বহুল প্রতীক্ষিত নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। শেষ মুহূর্তে ঠিক কী কারণে ছাত্রদলের
নতুন কমিটি আটকে গেল, তা নিয়ে ছাত্রদল
ও বিএনপির সর্বস্তরে ব্যাপক কৌতূহল ও নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপি
ও ছাত্রদলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন প্রজন্মের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সংগঠনের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেতৃত্ব নির্বাচনে নতুন মাত্রা যুক্ত করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নবীনদের সামনে
আনা হবে, নাকি বিগত দেড় দশকের রাজপথের কঠিন আন্দোলনে থাকা অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতাদের
প্রাধান্য দেওয়া হবে—মূল আলোচনা এখন এটিকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
দলীয়
সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া থেমে নেই; বরং তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে
একটি গতিশীল নেতৃত্ব গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে
গভীরভাবে যুক্ত করা হয়েছে আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব এবং সংগঠনের কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতা।
নতুন
কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, গত মাসে ছাত্রদলের
বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক
নাছির উদ্দীন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করার পরই একটি আংশিক বা পাঁচ সদস্যের
কমিটি ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে ওই বৈঠকের পর
সরকারসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ মহল থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বর্তমান ‘জেন-জি’ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ভাবনা, মানসিকতা, প্রত্যাশা ও চাহিদা মাথায়
রেখে ছাত্রদলের নতুন রূপরেখা সাজানোর বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পরামর্শের পর
সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়। একপক্ষে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও শিক্ষার্থীবান্ধব মুখগুলোকে নেতৃত্বে
আনার তাগিদ দেওয়া হয়, অন্যদিকে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করা ত্যাগী নেতাদের শীর্ষে রাখার পক্ষেও বিভিন্ন পর্যায় থেকে মতামত উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয় সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নতুন সভাপতি পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান নীতিগতভাবে নির্ধারণ করে রেখেছেন। তবে মূল চিন্তাভাবনা এবং ব্যাপক আলোচনা চলছে সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিয়ে। প্রার্থীর অতীত অভিজ্ঞতা, সাম্প্রতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগের সক্ষমতা—এই তিনটি মৌলিক
বিষয়কে সমন্বয় করেই নেতৃত্বের সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা চলছে।
অবশ্য
বিএনপির নীতিনির্ধারণী স্তরের একটি অংশ মনে করে, ছাত্রদলকে পুরোপুরি তারুণ্যনির্ভর সংগঠনে রূপান্তর করা উচিত। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত পুরোনো বা প্রবীণ শিক্ষাবর্ষের
নেতাদের প্রাধান্য নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে নানা সমালোচনা রয়েছে। বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের বয়সের ব্যবধান কমানো এবং উদীয়মান প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য জুনিয়র নেতাদের সামনে নিয়ে আসার যৌক্তিকতা তারা তুলে ধরছেন।
অন্যদিকে,
তারেক রহমানের কাছে পরামর্শ দেওয়া অপর একটি অংশের মতে, বিগত দেড় দশকের চরম প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে মাঠে টিকে থাকা নেতাদের একটি বড় অংশ অসংখ্য মামলা, গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবরণের
শিকার হয়েছেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের সহিংসতা ও রাজনৈতিক নির্যাতন
মোকাবেলা করার সরাসরি বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে। পাশাপাশি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবিরের কৌশল সম্পর্কেও তাঁরা ভালোভাবে অবগত। তাই আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত এসব নেতাদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে কেবল অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের হাতে শীর্ষ নেতৃত্ব তুলে দেওয়া সংগঠনকে সাংগঠনিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে বিএনপির হাইকমান্ড এই দুই ভিন্ন
মতামতের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শীর্ষ প্রধান দুই পদের একটিতে অপেক্ষাকৃত সিনিয়র এবং অন্যটিতে জুনিয়র নেতাকে স্থলাভিষিক্ত করা হতে পারে।
ছাত্রদলের
নেতৃত্ব নির্বাচনের এই জটিল প্রক্রিয়ার
পেছনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলাফলও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফলাফল অর্জন করলেও ছাত্রদলের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক ছিল না। ফলস্বরূপ, আগামী দিনে অনুষ্ঠিতব্য ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে সংগঠনকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।
শুধু দলীয় কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ
শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার মতো গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সংগঠনে
অকৃত্রিম শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল রোধ করা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানোর বিষয়টিও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
ছাত্রদলের
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল
ইসলাম ও নাছির উদ্দীনের
নেতৃত্বে গঠিত দুই বছর মেয়াদী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ ইতিমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব চয়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বিস্তারিত তথ্য ও মতামত সংগ্রহ
করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। জানা গেছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন নিউইয়র্ক সফরের আগেই যেকোনো সময় নতুন কমিটির ঘোষণা আসতে পারে। সফরকালে কোনো কারণে বিলম্ব হলে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর নতুন কমিটির
আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটবে। বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে এবং বর্তমান নেতৃত্ব সাংগঠনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে অব্যাহত রেখেছে।