অনলাইন রিপোর্টার
সরকারি কেনাকাটায় পণ্য ও সামগ্রীর অস্বাভাবিক দর ফারাক এবং অনিয়ম ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সব সরকারি প্রকৌশল সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন ও একক দরতালিকা (রেট শিডিউল) প্রণয়ন করার জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতদিন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একই ধরনের পণ্যের ক্রয়মূল্যে বিশাল বৈষম্য ও অস্বাভাবিক দাম ধরার প্রবণতা দেখা গেছে। যার একটি উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসের জন্য একেকটি বালিশ ৬ হাজার ৯৫৭ টাকা থেকে শুরু করে অবিশ্বাস্য ৮৯ হাজার ৯০০ টাকায় কেনা হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারের জন্য একটি বালিশের প্রস্তাবিত দর ছিল ২৭ হাজার ৭২০ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে একেকটি গগলসের দাম ৫ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ হাজার টাকা এবং রক্ত পরীক্ষার ক্ষুদ্রাকার একটি টিউবের দাম ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছিল। সরকারি কেনাকাটায় পণ্যের এই অস্বাভাবিক দর নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় সব প্রকৌশল সংস্থার জন্য একক দরতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি।
কমিটির সদস্যরা মনে করছেন, দেশের সব প্রকৌশল দপ্তরের জন্য একটি একক দর কাঠামো তৈরি করা হলে একই ধরনের নির্মাণকাজ বা উপকরণ কেনাকাটায় দপ্তরভেদে আলাদা ও ইচ্ছামাফিক দর নির্ধারণের অপসুযোগ অনেকটাই কমে আসবে। গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সরকারি নির্মাণকাজের দর তফসিল পুনর্নির্ধারণ করতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সরকারি সংস্থাগুলোর প্রধান প্রকৌশলী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগ্য প্রতিনিধিদের রাখা হয়। কমিটি ইতিমধ্যে একাধিক বৈঠক সম্পন্ন করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একক দরতালিকা বাস্তবায়নের অর্থ এই নয় যে দেশের সব এলাকার কাজ একই খরচে করতে হবে। পাহাড়ি, দুর্গম, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, যাতায়াত দূরত্ব এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক (জোনাল) দর রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মূল দরকাঠামো অভিন্ন হলেও বিশেষ এলাকার অতিরিক্ত খরচ আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে।
এ বিষয়ে কমিটির সদস্যসচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ জানান, ইট, রড, সিমেন্ট ও বালুর মতো সর্বজনীন নির্মাণসামগ্রীর জন্য একটি অভিন্ন একক দরতালিকা থাকবে। আর যেসব সংস্থার কিছু বিশেষায়িত কাজ রয়েছে, তাদের জন্য থাকবে আলাদা বিশেষ দরতালিকা। শিগগিরই এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে।
প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, স্থির দরতালিকার পরিবর্তে বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় ও কর কাঠামোর পরিবর্তন বিবেচনা করে দরতালিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ করতে একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করেছে কমিটি।
প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালে প্রতি ডলারের গড় মূল্য ৮৪ টাকা থাকলেও ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকায়। এ ছাড়া বিটুমিন, পাথর ও বালুর মতো মৌলিক নির্মাণ সামগ্রীর আন্তর্জাতিক বাজারদর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে সংগৃহীত হয়ে তাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করা হবে, যা দেখে সংস্থাসমূহকে তাদের প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।
বর্তমানে গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব দরতালিকা রয়েছে; তবে জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সেতু বিভাগের নিজস্ব কোনো দরতালিকা নেই। অভিন্ন রেট শিডিউল চালু হলে দপ্তরগুলোর মাঝের এই চরম বৈষম্য দূর হবে।
তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, কেবল একক দাম নির্ধারণ করলেই অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ হবে না। সমস্যার শিকড়ে গিয়ে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও ক্রয় বিধি (পিপিআর) পুরোপুরি অনুসরণ করতে হবে এবং বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) মাধ্যমে কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়া সংস্কার করা গেলে সরকারি কেনাকাটায় প্রকৃত স্বচ্ছতা ফিরবে।