সংস্কার বাস্তবায়নের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তাঁদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই এবং অর্জিত সংস্কারগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংসদের কার্যক্রম এবং সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “মানুষের রক্তের ওপর দিয়ে আমরা তাঁদের ক্ষমতা দিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এখন যে সামান্য অর্জন হয়েছে, সেটুকু ধরে রাখতে হলে তাঁদেরও মাঠে নামতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সংসদে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো পাশ না করে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১১টি এখনও আইন হিসেবে কার্যকর করা হয়নি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই অধ্যাদেশগুলো জনগণের স্বার্থে করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেগুলো সংসদে তোলা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ থাকে।”
তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এখন নীরব থাকার সুযোগ নেই। “তাঁরা তো এই আইনগুলো করেছিলেন। এখন যদি সেগুলো বাতিল হয়ে যায়, তাহলে তাঁদের অবশ্যই জনগণের সামনে ব্যাখ্যা দিতে হবে,”—যোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, একটি পরিকল্পিত ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে বিএনপির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলে জনগণের প্রত্যাশিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “এখন যদি তাঁরা (সাবেক উপদেষ্টারা) নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যান, তাহলে জনগণ তাঁদের প্রশ্নের মুখোমুখি করবে। জনগণের কাঠগড়ায় তাঁদের দাঁড়াতে হবে।”
সংসদের বর্তমান কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সংসদে যে আলোচনা চলছে, তা অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার মতো এবং বাস্তব সমস্যাগুলো সেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা চলছে, কিন্তু জনগণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর আলোচনা নেই। আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চাই, সেই পরিবেশ সংসদে নেই। এজন্যই আমাদের রাজপথে নামতে হচ্ছে।”
সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সংসদকে কার্যকর রাখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তারা সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না। ফলে সংসদের একটি বড় অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশে দুটি নির্বাচন হয়েছে—গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ কার্যকর থাকলেও গণভোটের মাধ্যমে গঠিত হওয়ার কথা ছিল যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, সেটি কার্যকর করা হয়নি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দায়িত্ব সংসদের ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে গেছে এবং সংসদের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।”
সবশেষে তিনি বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাজনৈতিক দল ও সাবেক উপদেষ্টাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে এবং জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।
আকাশজমিন / আরআর