বিনোদন ডেস্ক
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্প নির্দেশক ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ মারা গেছেন। গতকাল বুধবার রাত দেড়টার দিকে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা এন রাশেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তরুণ ঘোষের বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৩ বছর। তিনি স্ত্রী ও এক ছেলে সন্তান রেখে গেছেন।
তরুণ ঘোষ রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে ভারতের বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭৯ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের একজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি এম এস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ফোক পেইন্টিং রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রোগ্রাম’-এ কাজ করেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করার পর ২০১২ সালে ‘কিপার’ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
চিত্রকলার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনায়ও তরুণ ঘোষের অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় আবু সাইয়ীদের চলচ্চিত্র ‘কিত্তনখোলা’-এর জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নরসুন্দর’, এন রাশেদ চৌধুরীর ‘চন্দ্রাবতী কথা’-সহ একাধিক চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি এন রাশেদ চৌধুরীর মুক্তিপ্রতীক্ষিত সিনেমা ‘সখী রঙ্গমালা’-তেও শিল্প নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন।
তরুণ ঘোষের চিত্রকর্ম ও নকশা শিল্পেও তিনি অনন্য প্রতিভা প্রদর্শন করেছেন। তার বিখ্যাত ‘বেহুলা’ সিরিজ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় এবং এশিয়ান আর্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। শিল্পকলা ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তার অবদান বাংলাদেশে সৃজনশীল শিল্পজগতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
শিল্পকলার পাশাপাশি তরুণ ঘোষ শিক্ষাব্যক্তিত্ব হিসেবেও সমাদৃত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিল্পচেতনা ও চিত্রকলা সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলার জন্য তাকে স্মরণ করা হয়। তার শিক্ষাদান এবং গবেষণামূলক কাজগুলোর মাধ্যমে অনেক নতুন প্রতিভার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তরুণ ঘোষের বিশেষ অবদান হলো শিল্প নির্দেশনা এবং ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনা। তার নির্দেশনায় চলচ্চিত্রগুলোতে গল্প, দৃশ্য এবং চরিত্রের মধ্যে সুক্ষ্ম সামঞ্জস্য ও শিল্পময় উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যেত। তার কাজ প্রজন্মের চলচ্চিত্রকার ও চিত্রশিল্পীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
তরুণ ঘোষের মৃত্যু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও চিত্রকলার জগতে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিল্পী, শিক্ষাবিদ এবং চলচ্চিত্রকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর জীবন ও কাজ প্রজন্মের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।