রাজনৈতিক ডেস্ক:
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে ১৫ কোটি টাকা এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা ‘নিয়েছেন’ বলে জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মোস্তাক মিয়ার তোলা অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ ও কড়া জবাব দিয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি বিশেষ পোস্ট দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণে জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে তার ফোনালাপের একটি অডিও ক্লিপও জনসম্মুখে ফাঁস করে দিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।
শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যার দিকে দেওয়া ওই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া এখন নিজের আগের বক্তব্য পরিবর্তন করেছেন। তিনি এখন সুর নরম করে বলছেন যে, ব্যক্তি বিশেষকে নয়, বরং এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই এই টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। গণমাধ্যমে নাকি তার পুরো বক্তব্যটি সঠিকভাবে আসেনি। নিজের ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশাসকের সঙ্গে হওয়া কথোপকথনের যে অডিও ক্লিপটি যুক্ত করেছেন, সেখানে জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়াকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে শোনা যায়, ‘আমি তো বলি নাই যে আপনি টাকাটা খাইছেন। এলাকার উন্নয়নের কাজের জন্যই তো টাকাটা নিছেন। হয়তো মিডিয়ায় আমার পুরো বক্তব্যটা আসেনি।’
নিজের ফেসবুক পোস্টে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে হাসনাত আবদুল্লাহ আরও লিখেছেন, কুমিল্লার বর্তমান প্রশাসক বিএনপির একটি দলীয় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিলেন যে, হাসনাত ও আসিফ মিলে জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে মোট ২৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে আমি নাকি একাই ১০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছি। উনার এই রাজনৈতিক বক্তব্যটি সাধারণ মানুষ শুনলে স্বাভাবিকভাবেই মনে করবেন যে, এই বিশাল অঙ্কের টাকাটা আমরা দুজনে মিলে নিজেদের পকেটে ঢুকিয়েছি বা পকেটস্থ করেছি।
জেলা পরিষদের প্রশাসকের দেওয়া এই বক্তব্যে অন্তত দুটি ‘চরম অসত্য তথ্য রয়েছে’ দাবি করে হাসনাত আবদুল্লাহ তা ক্রমান্বয়ে খণ্ডন করে লিখেছেন, প্রথমত, এই অর্থ বরাদ্দ জেলা পরিষদের নিজস্ব কোনো রাজস্ব খাত থেকে দেওয়া হয়নি। দেশের অন্যান্য উপজেলার মতো কুমিল্লার দেবিদ্বারেও এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি (ADP) প্রকল্পের বিশেষ আওতায়, যা পরবর্তীতে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। দেবিদ্বার উপজেলার উন্নয়নের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি টাকা। জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব খাতের সঙ্গে এই বরাদ্দের দূরতম কোনো সম্পৃক্ততাই নেই। সুতরাং এটিকে জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব খাতের অর্থ বলে দাবি করা স্পষ্ট মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর শামিল।
দ্বিতীয় ‘অসत्य তথ্যের’ বিষয়টি জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রশাসক মোস্তাক মিয়া দাবি করেছেন যে টাকাটা আমরা ব্যক্তি হিসেবে নিয়েছি। অথচ বাস্তব সত্য হলো এই অর্থ দেবিদ্বার উপজেলার মোট ৪২টি জনগুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়ম মেনে ব্যয় করা হয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আমাদের কারও সঙ্গে এই রাষ্ট্রীয় অর্থের কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কই নেই। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে এই অর্থ সরকারি নিয়ম মেনে ব্যয় করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, হাসনাত আবদুল্লাহ তার ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে এই অর্থ কোন কোন খাতে এবং কোন কোন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে, তার সম্পূর্ণ খাতভিত্তিক ব্যয়ের বিবরণীও প্রমাণ হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন।
কুমিল্লার প্রশাসকের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, দেশের সরকারি রাজস্ব বরাদ্দ এবং এডিপি বরাদ্দের মধ্যকার সাধারণ ও মৌলিক পার্থক্য না বুঝেই একজন দায়িত্বশীল পদে বসা ব্যক্তি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট বক্তব্য দিলেন। আর অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এ দেশে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা খুবই সহজ। জেলা পরিষদ থেকে স্থানীয় উপজেলার উন্নয়নের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া কোনো অস্বাভাবিক বা নতুন বিষয় নয়। প্রতি বছরই রাষ্ট্রীয় বাজেটের আওতায় নিয়ম মেনে এ ধরনের উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। দেবিদ্বার উপজেলার জন্য দেওয়া এই সরকারি বরাদ্দও সম্পূর্ণভাবে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ব্যয় হয়েছে। সেই ব্যয়ের প্রতিটি নথিপত্র এবং প্রতিটি টাকার হিসাব সরকারি দপ্তরে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে এখানে কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়মের প্রশ্নই ওঠে না।