বগুড়া প্রতিনিধি
উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় সড়কে বের হয়ে নিরাপদে সুস্থ শরীরে ঘরে ফেরাই যেন দিন দিন কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। জেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক ও জাতীয় মহাসড়কগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই অকাতরে ঝরছে তাজা প্রাণ। কোথাও বেপরোয়া বাসের পিষ্টে প্রাণ হারাচ্ছেন মেহনতি শ্রমিক, কোথাও ট্রাক ও পিকআপের বিকট সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটছে, আবার কোথাও দ্রুতগামী যানবাহনের প্রচণ্ড ধাক্কায় মুহূর্তেই পিষে যাচ্ছে নিরীহ পথচারী। লাগামহীন এসব সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো বগুড়া জেলা জুড়েই এখন সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর আতঙ্ক ও শোকাবহ পরিবেশ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বগুড়া সার্কেলের প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালে জেলায় মোট ১১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৫ জন নিহত এবং ১৩৩ জন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তবে চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বিগত আট সাড়ে আট মাসে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ৮২টি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৫ জন। সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি খাতায় উঠে আসা এসব পরিসংখ্যানের চেয়েও প্রকৃত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বাস্তব চিত্র অনেক বেশি করুণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্ঘটনার তথ্য পুলিশ প্রশাসন পর্যন্ত পৌঁছায় না, আবার দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও হয়রানি এড়াতে স্বজনেরা থানায় না জানিয়ে মরদেহ দাফন করে ফেলেন। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের বগুড়া শহরের চারমাথা থেকে কাহালু হয়ে দুপচাঁচিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৯ কিলোমিটার পথ এখন স্থানীয় পরিবহন চালক ও সাধারণ যাত্রীদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কের অপর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন আন্তঃজেলা বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, দ্রুতগতির পিকআপ ও মাইক্রোবাস চলাচল করে। আবার একই সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, স্থানীয় নছিমন, করিমন ও ভটভটির মতো ধীরগতির ও অননুমোদিত যানবাহন। একই সরু সড়কে ভিন্নমাত্রার গতির এসব যানবাহন চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং করা, চালকদের বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে চরম দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত কেবল কাহালু-দুপচাঁচিয়া উপজেলা অংশে আটটি আলোচিত দুর্ঘটনায় ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।
এদিকে চলতি আগস্ট মাসের প্রথম নয় দিনেই বগুড়ার বিভিন্ন সড়কে চারটি পৃথক ও আলোচিত দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন ২৫ জন। ১ আগস্ট কাহালুর কাজীপাড়া বউবাজার এলাকায় ট্রাক-পিকআপ মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। ৩ আগস্ট শেরপুরে মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাাককে বাসের ধাক্কায় বাসের হেলপারসহ দুজন নিহত হন। এরপর ৭ আগস্ট সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে সদর উপজেলার এরুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে; সেখানে একটি বাসের নিয়ন্ত্রণে হারিয়ে কাজের অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের ওপর উঠে গেলে মোট সাতজন শ্রমিক প্রাণ হারান। সর্বশেষ ৯ আগস্ট শজিমেক হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাককে অপর একটি ট্রাক ধাক্কা দিলে দুজন নিহত হন। মাত্র নয় দিনে ১৫ জনের এই নির্মম মৃত্যু বগুড়ার সড়ক নিরাপত্তার দৈন্যদশা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতাকে পুনরায় বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। ফিটনেসবিহীন ও জরাজীর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক আইনের শিথিলতা, মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং চালকদের দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীন গাড়ি চালানোই মূলত এসব সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ।
এ বিষয়ে বিআরটিএ বগুড়া সার্কেলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ হারুন উর রশিদ জানান, আঞ্চলিক মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানের মতো অবৈধ যানবাহনের যাতায়াতই দুর্ঘটনার বড় কারণ। এসব বাহনের প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না। তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। তবে পাশাপাশি মহাসড়কগুলোকে বিভাজকের মাধ্যমে একমুখী সড়কে রূপান্তর করা এবং সড়কের পাশের অপরিকল্পিত হাট-বাজার সরিয়ে দেওয়া জরুরি। এছাড়া চালকদের টানা আট ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো এবং রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
বগুড়া জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) আতোয়ার রহমান জানান, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো একক কারণে ঘটে না। অবকাঠামো, চালকের দক্ষতা, সচেতনতা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে ভোরের দিকে চালকদের ঘুমঘুম চোখে গাড়ি চালানো এবং অনভিজ্ঞ থ্রি-হুইলার চালকদের ট্রাফিক আইনি অজ্ঞতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একই প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, মহাসড়কে দূরপাল্লার দ্রুতগতির যান ও স্থানীয় ধীরগতির যানবাহনের মুখোমুখি অবস্থানই প্রাণহানির শঙ্কা বাড়ায়। শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করে ক্ষণিক সময়ের জন্য সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বগুড়ার সড়কে প্রতিদিনের এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হলে কেবল অভিযান বা নামমাত্র জরিমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে—অবৈধ যানবাহন নিষিদ্ধকরণ, চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম সুনিশ্চিত করা, বিপদজনক বাজার উচ্ছেদ এবং সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন সাধন অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।