ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের উত্তরখানে যুবলীগের গোপন বৈঠক, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৮ বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে ছেলের জন্মদিনে একফ্রেমে রাজ-শুভশ্রী বিয়ের আনন্দ রূপ নিল বিষাদে, সড়কে ঝরল ৪ প্রাণ ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা, ৯ জনের প্রাণহানি সুইডেনে সংসদ নির্বাচন: কট্টর ডানপন্থীদের সরকারে আসার জোর সম্ভাবনা

ট্রিলিয়ন ডলারের বিশ্ব হালাল বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?


  • আপলোড সময় : রবিবার ৩০ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:১৩ এএম

বিশ্বজুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্যের বাজার দ্রুত বড় হলেও এতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত নগণ্য। গত অর্থবছরে দেশ থেকে হালাল পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের, যেখানে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজারের আকার ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, শক্তিশালী কৃষিভিত্তি, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় ও বড় উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে মূলত আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সনদের সংকট, জটিল ও ব্যয়বহুল সনদপ্রক্রিয়া, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারের অভাব, পৃথক তথ্যভান্ডারের ঘাটতি এবং দুর্বল ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে।

 

বিভিন্ন গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে হালাল অর্থনীতির বাজারের আকার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামী এক দশকে এই বাজারের আকার আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। অথচ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের অংশ এক শতাংশেরও কম। বাংলাদেশের প্রধান হালাল রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাংস ও মাছ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের বাইরে ওষুধ, প্রসাধনী, পোশাক, পর্যটন ও সেবা খাতে প্রবেশ করতে পারলে রফতানি বহুগুণ বাড়ানোর বিপুল সুযোগ রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে পণ্যের মানের পাশাপাশি প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য হালাল সনদ। বর্তমানে দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) পৃথকভাবে হালাল সনদ দিয়ে থাকে। একাধিক প্রতিষ্ঠানের পৃথক সনদব্যবস্থা থাকায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং এই সনদ সব দেশে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ বড় বাজারগুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের প্রয়োজন হয়, যা না থাকায় ব্যবসায়ীদের তৃতীয় কোনো দেশের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি খরচে সনদ নিতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সময়, খরচ ও প্রশাসনিক জটিলতা।

 

সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় উচ্চ ব্যয়, দীর্ঘসূত্রতা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন উদ্যোক্তারা। তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্টিজের (বিসিআই) এক কর্মশালায় বিসিআইয়ের পরিচালক ও ইজি ফুডের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার অভিযোগ করেন, হালাল সনদ নিতে গেলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত অর্থ ও গাড়ি চাওয়া হয়। অনেক বিদেশি ক্রেতা বাধ্য হয়ে পণ্যের গায়ে শুধু 'হালাল' লিখে দেওয়ার পরামর্শ দেন, যা রফতানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আহমাদ ফরহাদ জানান, বাংলাদেশে প্রাপ্ত সনদ সৌদি আরবে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তাদের ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা সনদ নিতে হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বিএসটিআই জানিয়েছে, সনদের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের মান নিশ্চিত করতে কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা চাওয়া হয়। বেঙ্গল মিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমদ আসিফ জানান, ক্রেতারা পশুর জন্ম থেকে প্যাকেজিং পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার তথ্য দেখতে চান। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারের অভাবে প্রয়োজনীয় সনদ পেতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল। এছাড়া হালাল পণ্যের জন্য পৃথক এইচএস (হারমোনাইজড সিস্টেম) কোড না থাকায় প্রকৃত রফতানির তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

ব্র্যান্ডিংয়ের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে, যেখানে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হালাল অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীরা দেশে একটি একক জাতীয় হালাল কর্তৃপক্ষ গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ, আইইউবিএটি বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম এবং বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ হালাল বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, জটিলতা নিরসন ও সমন্বিত নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন। অবকাঠামো ও নীতিগত বাধা দূর করা গেলে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের এই বাজার বাংলাদেশের রফতানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর