দেশে
ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও এতে মৃতের
সংখ্যা প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত তিন বছরের
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরে ডেঙ্গুর বিস্তার ও আক্রমণের তীব্রতা
অতীতের অনেক রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে মে মাসের তুলনায়
জুনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তিন গুণ, জুলাইয়ে তা আরও তিন
গুণ বাড়ে এবং আগস্টে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা
পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ এবং ডেন-২ নামক দুটি
ভিন্ন সেরোটাইপের যৌথ উপস্থিতি বা মিশ্র সংক্রমণের
কারণেই সারা দেশে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে।
সরকারি
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে
৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৪০ হাজার ৪৪
জন এবং মারা গেছেন ১১১ জন। গত বছরের অর্থাৎ
২০২৫ সালের একই সময় পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩০৭
জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৩০ জন। আবার ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৩২৫
জন এবং প্রাণহানি ঘটেছিল ৯৯ জনের। সরকারি
এই পরিসংখ্যানটি মূলত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বাড়ির ভেতরে
চিকিৎসাধীন বা মৃদু উপসর্গ
থাকা রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করে না। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা বহুগুণ বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকার
বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে
এখন ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগী শয্যা না পেয়ে এক
হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। সম্প্রতি রাজধানীর ফার্মগেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে কেবিনে
ভর্তি হওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন শিক্ষক খালেদা আক্তার, যা সাধারণ পরিবারের
ওপর তৈরি করছে প্রচণ্ড আর্থিক চাপ। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও, যেখানে শয্যা না পেয়ে মেঝে
বা বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এ বিষয়ে জানান
যে, সরকারি হাসপাতালে সবসময় রোগীর তুলনায় শয্যার সংখ্যা কম থাকে এবং
চিকিৎসাসেবা দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আইইডিসিআর-এর তথ্য বিশ্লেষণ
করে জানা গেছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন সেরোটাইপের (ডেন-১, ডেন-২,
ডেন-৩ ও ডেন-৪) মধ্যে এবার
প্রধানত ডেন-৩ বেশি সক্রিয়
হলেও দেশের অনেক এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে ডেন-২-এর লক্ষণীয়
প্রাদুর্ভাব রয়েছে। আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে নেওয়া
নমুনা পরীক্ষায় শহর এলাকায় ডেন-৩ এবং গ্রাম
এলাকায় ডেন-২-এর আধিপত্য
দেখা গেছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, একই সময়ে দুটি সেরোটাইপের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণেই হয়তো ডেঙ্গু এবার এত দ্রুত ছড়িয়ে
পড়ছে। পূর্বে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি নতুন কোনো সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমিত হলে তাঁর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জটিলতা কয়েক
গুণ বেড়ে যায়।
ঢাকার
বাইরেও এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল
বাশার সতর্ক করে বলেছেন যে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বা ব্রুটো ইনডেক্স
(বিআই) বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বান্দরবানের মতো পার্বত্য এলাকায় বিআই ৪০-এর ওপর
পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের
বাইরে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। খুলনা, চট্টগ্রাম এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগে হাসপাতালে শয্যা পাওয়ার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খুলনা বিভাগে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৩২৪
জন আক্রান্ত এবং ১৯ জনের মৃত্যু
নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ
ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, মশক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের
অভাব এবং নিয়মিত নজরদারির ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতি এখন প্রায় অনিয়ন্ত্রিত। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণ সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত সমন্বিত মশক নিধন অভিযান না চালালে চলতি
বছরের শেষে পরিস্থিতি ২০২৩ সালের সেই রেকর্ড প্রাদুর্ভাবের মতো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।