ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম নাটোরে প্রবাসীর শপিং মলে হামলা ও লুটপাট, ৫ কোটি টাকার ক্ষতি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায় না বিএনপি সরকার: প্রতিমন্ত্রী তিন নিরাপত্তারক্ষীসহ অপহৃত কালাতের রাজপুত্র শাহজাদা আহমেদজাই 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' শব্দ নিষিদ্ধের ঘোষণা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী পরীক্ষকের সামনে পুরুষরা কম ব্যথা অনুভব করেন: নতুন গবেষণা উইন্ডিজের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই মুশফিক! কাঁদুনে গ্যাসে ফরাসি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ, দাবি বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ফেনারবাখচেকে হারিয়ে ইউরোলিগে ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত জয়

সালমান শাহর মৃত্যু: আত্মহত্যার দাবি খারিজ করে এবার হত্যা মামলার নতুন মোড়


  • আপলোড সময় : রবিবার ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১০:২১ এএম

বিনোদন প্রতিবেদক  

ঠিক ৩০ বছর আগে ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর মরদেহ। সেটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই মৃত্যুর রহস্য আজও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় তিনটি পৃথক তদন্ত সংস্থা একাধিকবার একে 'আত্মহত্যা' বলে চিহ্নিত করলেও শুরু থেকেই এটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড দাবি করে আসছে তার পরিবার। সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআই—তিনটি সংস্থার তদন্তেই একে 'আত্মহত্যা' বললেও পরিবারের একের পর এক নারাজি ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে নতুন করে গতি পেয়েছে মামলাটি।

 

দীর্ঘ তিন দশকের মাথায় সম্প্রতি এক আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় বিচারে নতুন আশা দেখছে পরিবার। তবে অন্য মূল আসামিরা অধরা থাকায় স্বজনদের মনে ক্ষোভ জমেছে। সুদীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২০ অক্টোবর আদালতের আদেশে রমনা থানায় সালমানের সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করে নতুন করে হত্যা মামলা দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গত মে মাসে সিআইডির আবেদনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দেয় আদালত। এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যদিও বাদীপক্ষ এই আদেশ বাতিলের আবেদন জানালে তা বর্তমানে আদালতে নথিভুক্ত রয়েছে।

 

এদিকে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হলে ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০ আগস্ট ৭ দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ আগস্ট তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। তবে রিমান্ডের অনুমতি মিললেও ডনকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মজিবুর রহমান। অন্যদিকে, গত ৩০ আগস্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তদন্ত সংস্থা সিআইডি তা দাখিল করতে পারেনি। ফলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ধার্য করেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম।

 

লন্ডন থেকে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, "আশায় আছি, এবার তদন্ত শেষ হবে এবং ন্যায়বিচার পাব। আসামিরা দেশে আছে, তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। তারপরও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না? আসামিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেই সব রহস্য বেরিয়ে আসবে।"

 

মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বলেন, হত্যার সময় বাসায় সামীরা, ডলি, মনোয়ার ও কাজের লোক আবুল ছিল। সামীরাকে পুলিশ না পেলে তার শেষ স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তার খোঁজ মিলবে। তিনি আরও যোগ করেন, ডন তাদের মূল আসামি ছিল না, রিজভী নামের এক আসামির জবানবন্দিতে তার নাম এসেছে। তাদের মূল আসামি সামীরা ও তার মা-বাবা। তারা চান সব আসামি গ্রেপ্তার হোক এবং দ্রুত বিচার শেষ হোক।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান জানান, মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, সুদীর্ঘ একটা সময় পার হয়ে নতুন মামলা হয়েছে। এক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য উঠে আসতে পারে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে আসামিদের সাজা যাতে নিশ্চিত করা হয়, এমন প্রত্যাশার কথা জানান তিনি। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা আসামি ডনের আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কিছু বলতে চাননি।

 

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ। সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দিলে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি, যেখানে সালমানের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়। ১৯৯৭ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে প্রতিবেদনটি গৃহীত হলে কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন।

 

২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। সেখানেও হত্যার বিষয়টি নাকচ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সালমানের মা নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন এবং ১১ জনের নাম উল্লেখ করেন। এরপর মামলাটি র‌্যাবের কাছে গেলে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তিতে ২০১৬ সালে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারাও সালমান শাহকে 'হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি' মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

 

পিবিআই জানায়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ আর স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণাতে ভুগেই সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন বিচারক। পরবর্তীতে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদনের পর গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। ২১ অক্টোবর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় সামীরা হক ছাড়াও শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদকে আসামি করা হয়।

 

মামলার অভিযোগে আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তারা ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে জানতে পারেন সালমান ঘুমাচ্ছেন। পরে প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিমের ফোন পেয়ে দ্রুত গিয়ে তারা সালমানকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। তিন দশকের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এবার নতুন তদন্তে সত্য উদঘাটনের পথ চেয়ে আছে পরিবার।


এ সম্পর্কিত আরো খবর