ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের উত্তরখানে যুবলীগের গোপন বৈঠক, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৮ বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে ছেলের জন্মদিনে একফ্রেমে রাজ-শুভশ্রী বিয়ের আনন্দ রূপ নিল বিষাদে, সড়কে ঝরল ৪ প্রাণ

২৪ ঘণ্টায় নিখোঁজ ৪২, জানুয়ারি থেকে জুলাই ১৫,৭১৭ জন

শিশু নিখোঁজের জিডি নিতে গড়িমসি, তদন্তেও ‘অনীহা’ পুলিশের!


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১০:২৩ এএম

অনলাইন রিপোর্টার

রাজধানীর বনানী সৈনিক ক্লাবের সামনের ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় মা বিথী আক্তারের সঙ্গে জুতা কিনতে গিয়ে গত ৩০ আগস্ট মাত্র ৫ মিনিটের ব্যবধানে নিখোঁজ হয় চার বছরের শিশু সাইবা। কিন্তু নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধার করা দূরে থাক, জিডি নিতেই ঘোর অনীহা প্রকাশ করে পুলিশ। অভিযোগ জানাতে গিয়ে বনানী থানায় পরপর দুদিন অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হন মা বিথী আক্তার। নিখোঁজের দিন থানায় গেলেও অভিযোগ না নিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো হয় এবং নিজের মতো করে খোঁজার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরের দিন সোমবার সকালে আবার থানায় গেলে সেখান থেকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাইবার নানী থানায় উপস্থিত হলে ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টায়, অর্থাৎ নিখোঁজের পুরো দুদিন পর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করে পুলিশ।

 

জিডি নেওয়ার পর চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও)। নিখোঁজ সাইবার নানী শরীফা বেগম জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে ডেকে সরাসরি বলেন যে, বাচ্চা খুঁজে বের করা পুলিশের কাজ নয়; তাদের অন্যান্য অনেক কাজ রয়েছে। স্বজনরা নিজেরা সন্ধান পেলে পুলিশকে জানালে তারা কেবল গিয়ে উদ্ধার করে দেবে। ঘটনা ঘটে যাওয়ার এক সপ্তাহ অতিক্রম করলেও সাইবার কোনো খোঁজ মেলেনি। কেবল সাইবার পরিবারই নয়, দেশের বহু নিখোঁজ শিশুর স্বজনদের অভিযোগ—শিশু নিখোঁজের জিডি নিতে এবং পরবর্তীতে উদ্ধার তৎপরতায় থানা পুলিশের তীব্র গাফিলতি ও অনীহা রয়েছে।

 

এ অবস্থায় সামাজিক সংগঠন ‘মুন এলার্ট’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরে। সংবাদ সম্মেলনে প্রায় দুই ডজন নিখোঁজ শিশুর স্বজনরা বক্তব্য দেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা তাদের সন্তানদের ফিরে পেতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে ৩৫টি ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজন উপস্থিত ছিলেন।

 

পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। কোনো পুলিশ সদস্য অনীহা বা অসহযোগিতা করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনলাইন জিডিতেও বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী নিখোঁজ শিশুর ৪৭৪টি জিডির মধ্যে ৬৮ জন এবং ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী নিখোঁজ শিশুর ১৫,২৪৩টি জিডির মধ্যে ১,৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ রয়ে গেছে।

 

অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেনের দাবি, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তবে সিসিটিভি সুবিধা না থাকায় ফুটেজ পাওয়া যায়নি এবং তারা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তারা নিজেরা খোঁজার পরামর্শ ছাড়া পুলিশের কাছ থেকে কোনো বাস্তব সহায়তা পাচ্ছেন না।

 

একই ধরনের পুলিশের অবহেলার গল্প শোনা যায় খুলনা কয়রার বাজার থেকে নিখোঁজ হওয়া শিশু সামিরার মা বিলকিস বেগমের মুখে। গত বছরের আগস্টে সন্তান নিখোঁজ হলে সন্দেহভাজন 'আজমির' নামে এক যুবককে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে কড়া জিজ্ঞাসাবাদ না করে সাধারণ জিডি করে ছেড়ে দেয়। অভিযোগ উঠেছে, আসামি থানায় বসেই ওসির ফোন ব্যবহার করে বাইরে কথা বলেছে। পুলিশের এই ঢিলেঢালা ভাব ও গাফিলতির কারণে মূল আসামি পার পেয়ে গেলেও সন্তানকে আর ফিরে পাননি বিলকিস বেগম।

 

ঢাকার মিরপুর-১১ এলাকা থেকে গত ১৩ মে নিখোঁজ হয় শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ইব্রাহিমের বাবা মোহাম্মদ জসিম জানান, তার ছেলে বাসার ভবনে ঢোকার পর আর বের হয়নি যা সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট। কিন্তু পল্লবী থানা পুলিশ প্রথমে জিডি নিতে অস্বীকার করে এবং দুদিন ঘোরানোর পর ১৫ মে জিডি নেয়। পরবর্তীতে ১৭ দিন ঘুরিয়ে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। ইব্রাহিমের বাবা আক্ষেপ করে বলেন, থানায় বারবার গিয়ে মনে হয়েছে সন্তান হারিয়ে তারা নিজেরাই অপরাধী হয়ে গেছেন।

 

রাজবাড়ী থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. নজরুল ইসলাম জানান, গত ২০২৫ সালের মে মাসে তার সন্তান তামিম স্কুল থেকে আর ফিরে আসেনি। নিজে পুলিশের সাবেক সদস্য হয়েও তিনি থানা থেকে কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি। সন্তানের খোঁজে বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে গিয়ে তিনি জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ২৫ লক্ষাধিক টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে মুন এলার্টের প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও শিশু নিখোঁজের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তারা চান শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডির সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা একসাথে কাজ করুক। সংস্থাটি এ পর্যন্ত ১,২২৬টি শিশু নিখোঁজের অভিযোগ পেয়েছে, যার মধ্যে পুলিশের সহযোগিতায় ৮০০-র বেশি শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে মোট ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে।

বয়সভিত্তিক জিডির হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ০ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু: নিখোঁজের ঘটনায় মোট ৪৭৪টি জিডি হয়েছে (যার মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনও নিখোঁজ)।

  • ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু/কিশোর: নিখোঁজের ঘটনায় মোট ১৫,২৪৩টি জিডি হয়েছে (যার মধ্যে ১৩,২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১,৯৭০ জন এখনও নিখোঁজ)।

সারাদেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৪টি শিশু নিখোঁজের জিডি নথিভুক্ত হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়া মোট শিশুদের মধ্যে এখনও ২,০৩৮ জন (প্রায় ১৩ শতাংশ) শিশু-কিশোর উদ্ধারহীন অবস্থায় রয়েছে।



এ সম্পর্কিত আরো খবর