আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানীর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক আল আমিনের নেতৃত্বে গঠিত এক তদন্ত কমিটির সাম্প্রতিক আকস্মিক পরিদর্শনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী, প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক একটি উদ্যোগ। সরকারি আইন ও নিয়ম অনুসারে একটি জমি বা সম্পত্তির দলিলে নির্ধারিত ফি মাত্র চার হাজার টাকা হলেও অসাধু দলিল লেখকেরা সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের এই আকস্মিক সারপ্রাইজ ভিজিটের ফলে ঘুষ-দুর্নীতির মাত্রা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে এবং অসাধু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে শাস্তির ভয় তৈরি হবে। এই সাহসিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
পরিদর্শনকালে দুদক টিম দলিল লেখকদের স্পষ্ট দৃশ্যমান স্থানে দলিলের সরকারি মূল্য তালিকা টাঙিয়ে দেওয়ার কড়া নির্দেশ প্রদান করেছে। এই নির্দেশ কেবল ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অবিলম্বে সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কার্যকর করা জরুরি। সার্বিক বিচারে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়ন করা হলে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নাম শীর্ষ সারিতেই অবস্থান করবে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম ও নানা পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের একজন ঝাড়ুদার বা ক্লিনার ১০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক কিংবা একজন অফিস সহায়কের তিনটি নিজস্ব বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। একজন নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীর এমন বিপুল অর্থসম্পদ অর্জনের খবর চরম হতাশাজনক ও উদ্বেগের বিষয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন দেশের অন্যতম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কমিশনটির মাননীয় চেয়ারম্যান হচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রাক্তন দূরদর্শী বিচারপতি, যিনি সারাজীবন পরম সততা ও নিষ্ঠার সাথে দেশের সেবা করে এসেছেন। তাঁর যোগ্য ও গতিশীল নির্দেশনায় দুদক আগামীতে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে সাধারণ জনগণ দৃঢ়ভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করে। এই খাতের দুর্নীতি চিরতরে নির্মূল করতে কয়েকটি বাস্তবমুখী ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা বিবেচনা করা প্রয়োজন:
১. বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের সাব-রেজিস্ট্রারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহ করে প্রত্যেকের অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সঠিক ও স্বচ্ছ হিসাব নিতে হবে। বিশেষ করে, তদন্তের সুবিধার্থে তাদের শ্বশুরবাড়ির নিকটাত্মীয়দের নামে বেনামে থাকা সম্পদের হিসাবও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গ্রহণ করতে হবে।
২. সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ অফিস সহায়ক, এমনকি পিওন ও ঝাড়ুদার পর্যন্ত সকল কর্মচারীর সম্পদের সঠিক হিসাব নিতে হবে।
৩. জেলা রেজিস্টারগণ পূর্বে মাঠপর্যায়ে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তারাই পুরো জেলার সাব-রেজিস্ট্রারদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জেলা রেজিস্টারদেরও অর্জিত মোট সম্পদের হিসাব নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. দুদকের কার্যকারিতা বাড়াতে এর নিজস্ব জনবল বৃদ্ধি করে অন্তত ২০ হাজার করতে হবে, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়। একই সাথে দুদকের নিজেদের ভেতরে কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত অসাধু কর্মকর্তা অবস্থান করলে তাদের আগে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে এটি সত্য যে, কেবল দলিল লেখকদের ওপর নজরদারি বা তাদের আটক করলেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দীর্ঘদিনের শিকড় গড়া দুর্নীতি পুরোপুরি দূর হবে না। মূলত অসাধু দলিল লেখকদের মাধ্যমেই সাব-রেজিস্ট্রারগণ প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনা করেন। ভুয়া দালালচক্র চিহ্নিত করতে দুদক অভিযানে নামলেও অভিযোগ রয়েছে যে, এই চক্রটি সন্ধ্যার পর বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বর্তমানে আধুনিক কৌশলে সাব-রেজিস্ট্রারগণ সরাসরি নগদ টাকা গ্রহণ না করে বিশ্বস্ত দালালদের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের লেনদেন সম্পন্ন করেন এবং সুবিধাজনক স্থানে পাচার করেন। একজন সাধারণ নাগরিক জীবনের অর্জিত সর্বস্ব সঞ্চয় দিয়ে শেষ সম্বল হিসেবে এক খণ্ড জমি কেনেন। সেখানে সরকারি ফি মাত্র চার হাজার টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও তাকে বাধ্য হয়ে পাঁচ গুণ বা তার চেয়েও বেশি টাকা প্রদান করতে হয়। এই বাড়তি টাকার সুবিধা শুধু দলিল লেখক একা ভোগ করেন না; সাব-রেজিস্ট্রারের নির্ধারিত চাহিদা অনুযায়ী এই বিশাল অঙ্কের টাকা দিতে হয়। অসাধু চক্রটি সাধারণ জমিক্রেতার কাছ থেকে জোড়াতালি দিয়ে টাকা আদায় করে এবং নিজেদের পকেটেও সিংহভাগ টাকা রেখে দেয়।
এই প্রশাসনিক দুর্নীতির পাশাপাশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি করার এক ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রায় ১৯০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের নির্দিষ্ট তালিকা সংরক্ষিত রয়েছে, যারা ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে সম্পূর্ণ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ তৈরি করে চাকরি হাত বাগিয়েছেন।
অথচ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাদের অনেকেরই বয়স ৬ বছরের বেশি ছিল না। বিগত সরকারের মেয়াদে সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ও তৎকালীন আইনমন্ত্রীর সরাসরি যোগসাজশে তারা দীর্ঘদিন চাকরি করে গেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মুজিবনগর সরকারের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি পাওয়া আইয়ুব আলী আজ কয়েক শত কোটি টাকার পাহাড়সম অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিযোগ ওঠার পর এই চক্রটি আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী উদ্যোগ নিলে খুব সহজেই হাইকোর্টে উক্ত রিটের দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করে তা খারিজ করতে পারেন এবং প্রতারক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ফৌজদারি মামলা দায়ের করার ব্যবস্থা করতে পারেন। এই ১৯০ জন অসাধু সাব-রেজিস্ট্রার সারা জীবনে সরকারি কোশাগার থেকে অবৈধভাবে যে বিপুল পরিমাণ বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন, তা বাজেয়াপ্ত করে দ্রুত সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হচ্ছে। তবে একজন প্রবীণ প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব মাহবুব করিম মিলন যথার্থই বলেছেন—দুর্নীতিবাজদের বেতন বাড়িয়ে ১০ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করলেও তারা পকেট থেকে এক টাকা ঘুষ গ্রহণ ছাড়বে না, কারণ অনাচারের মাধ্যমে ঘুষ খাওয়া তাদের এক ধরনের নেশা ও মানসিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ও অত্যন্ত উর্বর মাটির এক সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সৎ হলে এই দেশ নিশ্চিতভাবেই উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের গতকালের এই আকস্মিক পরিদর্শন সারা দেশের অসাধু কর্মকর্তাদের কাছে এক কড়া সতর্কবার্তা পৌঁছে দেবে। তবে কেবল ঢাকার তেজগাঁও কমপ্লেক্সেই নয়, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দুদকের এমন সমন্বিত ও সক্রিয় নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে; তবেই এই স্পর্শকাতর খাতটি দুর্নীতিমুক্ত হবে।
আকাশজমিন / আরআর