ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে অত্যন্ত শক্ত ও আপসহীন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে স্বেচ্ছায় দেশে আসতে হবে না, বরং রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে ভারত থেকে সরাসরি ‘ধরে নিয়ে আসতে’ চায় সরকার।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের অগ্রগতি ও সামপ্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের সরাসরি জবাবে তিনি এসব চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক কিছু গুঞ্জন ও রাজনৈতিক আলোচনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডা. জাহেদ উর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বর্তমান সরকার যথেষ্ট আগ্রহী বা তৎপর নয় বলে যে আলোচনা কোনো কোনো মহল থেকে ছড়ানো হচ্ছে, তা একেবারেই সত্য নয়। সরকার এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনি আরও খোলসা করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরের সঙ্গে যখন শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে, তখন এই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার আর নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরে আসার প্রয়োজন নেই, বরং আইনি ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রশাসনের এই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আইনগত দিকগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে জোর দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে আইনগতভাবে একজন চিহ্নিত পলাতক আসামি এবং আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন অপরাধী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারকের বরাতে তিনি উল্লেখ করেন যে, সাজাপ্রাপ্ত এই আসামির জন্য উচ্চ আদালতে আপিল কিংবা দণ্ড পুনর্বিবেচনার আবেদন করার আইনি মেয়াদ ও সুযোগ ইতিমধ্যেই চূড়ান্তভাবে অতিক্রান্ত হয়েছে। কারিগরি ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা মাত্রই আদালতের সোপর্দকৃত সুনির্দিষ্ট মৃত্যুদণ্ড সরাসরি কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক এক অপ্রীতিকর ঘটনা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সম্প্রতি ইউরোপের দেশ ইতালিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর সংঘটিত ন্যাক্কারজনক হামলা ও সরাসরি হেনস্তার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। ডা. জাহেদ উর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শুধু বিশিষ্ট অভিনেত্রী বাঁধনই নন, সমসাময়িক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া অন্যান্য যে কোনো সাধারণ নাগরিক বা প্রতিনিধি এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংস হামলার শিকার হতে পারেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এই ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির পেছনে ভারতের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদিকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয়ে থেকে টানা বিভিন্ন ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। ঢাকায় অবস্থানরত ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে এ বিষয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তোলার জোরালো আহ্বান জানান তিনি। উপদেষ্টা আক্ষেপ করে বলেন, ভারত সরকারের তরফ থেকে একদিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুসংবাদ ও ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এমন কিছু বিতর্কিত ঘটনা ঘটতে দেওয়া হচ্ছে যা ইতিবাচক সম্ভাবনাকে নেতিবাচক দিকে ধাবিত করছে।
শেখ হাসিনার বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে যে কড়া প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। ডা. জাহেদ উর রহমান সবশেষে স্পষ্ট করেন যে, দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বিপাক্ষিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ককে সামনের দিকে সুস্থ ধারায় এগিয়ে নিতে হলে উভয়পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধাশীল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ভারত সরকার বাংলাদেশের বর্তমান সার্বভৌম সরকারের সঙ্গে পর্যাপ্ত ও সদর্থকভাবে সম্পৃক্ত হতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশকে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হবে।