ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের উত্তরখানে যুবলীগের গোপন বৈঠক, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৮ বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে ছেলের জন্মদিনে একফ্রেমে রাজ-শুভশ্রী বিয়ের আনন্দ রূপ নিল বিষাদে, সড়কে ঝরল ৪ প্রাণ ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা, ৯ জনের প্রাণহানি সুইডেনে সংসদ নির্বাচন: কট্টর ডানপন্থীদের সরকারে আসার জোর সম্ভাবনা

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ই-বর্জ্

ভাগাড়ে ফেলানো ই-বর্জ্যে বিষাক্ত হচ্ছে দেশের মাটি ও পানি


  • আপলোড সময় : বুধবার ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৮:৫০ এএম

অনলাইন রিপোর্টার

দেশে প্রতিদিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের (ই-বর্জ্য) পরিমাণ। বাসা-বাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের পর প্রতিদিন লাখ লাখ মুঠোফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর এবং এয়ারকন্ডিশনারসহ নানা ধরনের প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়ছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এসব ইলেকট্রনিক সামগ্রীর পরিবেশসম্মত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে অন্যান্য সাধারণ গৃহস্থালি আবর্জনার সঙ্গেই এগুলো আস্তাকুঁড়ে বা উন্মুক্ত ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও এগুলো আলাদাভাবে সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এর সঙ্গে সম্প্রতি নতুন আতঙ্ক হিসেবে যুক্ত হচ্ছে সোলার প্যানেল ও বিভিন্ন ব্যাটারির বর্জ্য।

 

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে সিসা, সিলিকন, টিন, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়াম এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এই বর্জ্যগুলো যখন খোলা জায়গায় ফেলা হয়, তখন এর ক্ষতিকর রাসায়নিক সরাসরি দেশের মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে পরিবেশকে দূষিত করছে। পরবর্তীতে খাদ্যশৃঙ্খল ও পানির মাধ্যমে এই বিষাক্ত পদার্থগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা রকম মরণব্যাধি তৈরি করছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের জন্য এই স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে ই-বর্জ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, বছরে দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা রিসাইক্লিংয়ের আওতায় আসে। বাকি ৯৭ শতাংশ বর্জ্যের স্থান হয় খোলা ভাগাড় বা নালা-নর্দমায়। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে বার্ষিক ই-বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়ে যেতে পারে প্রায় ৪৬ লাখ টনে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ই-বর্জ্যের প্রভাবে মানবদেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, টিস্যু ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা বিষাক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে মানুষের শ্বাসযন্ত্র, প্রজনন ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্নায়ুতন্ত্র ও মূত্রতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজকর্ম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

 

পূর্বে কেবল মোবাইল, কম্পিউটার কিংবা জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্য নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ খাত। গত এক দশকে গ্রামীণ ও শহর এলাকায় দ্রুত বেড়েছে সোলার হোম সিস্টেম, বাসাবাড়ির ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারিচালিত মেকানিজম। এই সোলার যন্ত্রাংশগুলোর গড় আয়ু ১৫ থেকে ২৫ বছর হয়ে থাকে। ফলে এখন বিপুল পরিমাণ পুরোনো সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বর্জ্যে পরিণত হতে শুরু করেছে।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘ক্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এর ক্লাইমেট সেন্টারের এক যৌথ গবেষণা উঠে এসেছে, বর্তমানে দেশে বসানো সোলার ফটোভোল্টাইক সেলগুলো থেকে নিকট ভবিষ্যতে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে। সময়মতো সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই বর্জ্য থেকে প্রায় ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং ৫০ টনের মতো মূল্যবান তামা উদ্ধার করা সম্ভব। তবে সঠিক ও আধুনিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু না থাকায় এই ধাতব বর্জ্যগুলো বিষাক্ত রাসায়নিকে রূপ নিচ্ছে।

 

একইভাবে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে লিথিয়াম-আয়ন এবং লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্য দ্রুত বাড়ছে। তবে এসব ব্যাটারি নিরাপদে সংগ্রহ, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহারের জন্য কোনো কঠোর বা মানসম্মত নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরোনো ব্যাটারিগুলো খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হচ্ছে কিংবা পুরান ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ও বিষাক্ত উপায়ে আগুনে গলানো হচ্ছে।

 

বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন গলি, শহরের উপকণ্ঠের স্ক্র্যাপ মার্কেট কিংবা অস্থায়ী ঝুঁকিপূর্ণ কারখানায় কোনো প্রকার নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই বর্জ্য পুড়িয়ে, এসিড প্রয়োগ করে কিংবা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দামি ধাতু আলাদা করা হচ্ছে। এতে কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিদিন সরাসরি বিষাক্ত কেমিক্যালের সংস্পর্শে এসে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

 

রাজধানীর সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার জানান, বর্তমানে ই-বর্জ্য আলাদাভাবে সাজানোর মতো কোনো ব্যবস্থা তাদের নেই, সাধারণ গৃহস্থালি ময়লার সঙ্গেই তা সংগ্রহ করা হয়। তবে আধুনিক ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কোরিয়ান এক কোম্পানির সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রিসোর্স রিকভারি সেন্টার তৈরির চুক্তি সই করেছে। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্য আলাদা করা হবে। যেখানে প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার এবং বায়োগ্যাস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ খুব দ্রুতই শুরু হতে যাচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর