জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন সংস্থাটির সচিব সাইদুর রহমান একই সঙ্গে দুদকের আইনগত অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে সংক্ষুব্ধ বা ভুক্তভোগী যেকোনো ব্যক্তি নিজের মতামত কিংবা বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ৯ সেপ্টেম্বর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির অবস্থান তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।
দুদক সচিবের ব্যাখ্যা ও বক্তব্য প্রেস ব্রিফিংকালে সাংবাদিকরা দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার (পিআরও) পূর্ববর্তী কিছু মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুললে সচিব সাইদুর রহমান খান বিষয়টি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ আইন ও প্রচলিত বিধিমালা অনুসরণ করেই অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। ভুক্তভোগী কিংবা সংক্ষুব্ধ যেকোনো নাগরিক আইনি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিজ নিজ বক্তব্য দিতে পারেন, এতে কমিশনের কোনো বিধিনিষেধ নেই। অনুসন্ধান শুরুর প্রথম দিনে গণমাধ্যমের সামনে ব্রিফিংকালে দুদকের পিআরও যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল উল্লেখ করে সচিব জানান, ওটি ছিল মূলত একটি 'স্লিপ অব টাং'।
আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ এর আগে একই দিন সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দুদকের এই আইনি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের এই অনুসন্ধান কার্যক্রম মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, দমন-পীড়ন এবং জনমনে ভয় দেখানোর এক সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, এই অনুসন্ধানের আসল উদ্দেশ্য কোনো ধরনের দুর্নীতি খুঁজে বের করা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে তাঁকে ও তাঁর দলকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং তথাকথিত 'মিডিয়া ট্রায়াল' চালানো।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, মানুষের সামনে যেসব অভিযোগ তুলে ধরা হচ্ছে, তার প্রতিটিই অসত্য ও মনগড়া। তাঁদের মতে, এই অনুসন্ধান আসলে কোনো নিরপেক্ষ আইনি অনুসন্ধান নয়, এটি সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করার একটি অপকৌশল। ফ্যাসিবাদী আমলে যেভাবে স্বাধীন মতামত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নানা অজুহাতে দমন-পীড়ন করা হতো এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে মুখ বন্ধ রাখা হতো, বর্তমান প্রক্রিয়াটিও ঠিক একই ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানের পটভূমি ও তদন্ত দল গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং কেনাকাটাসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসলে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে দুদকের উপ-পরিচালক জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ শক্তিশালী টিম গঠন করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরা হলেন— যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, তৎকালীন যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং তৎকালীন উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।
দাপ্তরিক নথি তলব অভিযোগ অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় তদন্ত শুরুর পরদিনই, অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিপত্র পাঠায় দুদক। কমিশনের প্রেরিত চিঠিতে চার ক্যাটাগরির সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নথিপত্র অবিলম্বে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে বিশেষ করে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব ধরনের নিয়োগ, পদোন্নতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত বিস্তারিত ফাইলপত্রের অনুলিপি তলব করা হয়েছে। একই সাথে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূল অনুসরণ করে সম্পাদিত বদলি সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক নথিপত্র পর্যালোচনা করার জন্য দুদক কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়।
উত্থাপিত অভিযোগের পরিধি কমিশনের সূত্র অনুযায়ী জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এসে পৌঁছেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বেআইনি সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ প্রক্রিয়ায় মানিলন্ডারিং এবং নিষিদ্ধ বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেনের অভিযোগ। এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং নিজস্ব আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে একাধিক ভুক্তভোগী লিখিতভাবে দুদকে অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
মানহানির দাবি ও ক্ষোভ কমিশনের অনুসন্ধানের খবর ও নানা তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি দাবি করেন, অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত সম্মান ও সামাজিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিডিয়া ট্রায়াল চালিয়ে তাঁর মানহানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি এই ধরণের আচরণের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।