ক্রীড়া ডেস্ক
আরেকটি এশিয়া কাপ, আরেকটি সেমিফাইনাল, প্রতিপক্ষ সেই শক্তিশালী ভারত এবং ফলাফলেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি—হতাশাজনক পরাজয়। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের জন্য এই ছকটি যেন চিরচেনা এক বৃত্তে রূপ নিয়েছে। চলমান এশিয়া কাপের প্রথম সেমিফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয়ে ৪০ রানের ব্যবধানে হেরে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙেছে নিগার সুলতানা জ্যোতির দলের। ভারতের ছুঁড়ে দেওয়া ১৫০ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন-আপ। সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে খেলোয়াড়দের নিবেদন, মানসিকতা এবং পরিকল্পনা নিয়ে ক্রিকেটপাড়ায় তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই মেয়েদের ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স এবং জয়ের স্পৃহাহীন মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
দলের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও ধীরগতির ব্যাটিংয়ে ব্যাটারদের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা আবার নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে নারী দলের ব্যাটিং কোচ নাসিরউদ্দিন ফারুকীকে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তিনি নারী দলের দায়িত্বে থাকলেও ব্যাটারদের মানসিকতা ও টি-টোয়েন্টি উপযোগী স্কিলে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। ফলে ব্যাটিং কোচে পরিবর্তন আনা এখন বিসিবির জন্য সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিসিবির শীর্ষ এক পরিচালক ইঙ্গিত দিয়েছেন, আসন্ন এশিয়ান গেমস শেষেই নারী দলের পুরো কোচিং প্যানেলে বড় ধরনের রদবদল আনা হতে পারে।
নারী দলের সাবেক অধিনায়ক রুমানা আহমেদ পুরো এশিয়া কাপের ম্যাচগুলো দুবাই থেকে সরাসরি মাঠে বসে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব ও পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ব্যাটিংয়ের এই দুর্বলতা নতুন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের সমস্যা। ছোটখাটো দলগুলোর বিরুদ্ধে এই ব্যাটিং নিয়ে উতরে যাওয়া গেলেও শক্তিশালী দলগুলোর সামনে বাংলাদেশের কৌশল একদম ভেঙে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, তরুণ ব্যাটার স্বর্ণা ছাড়া আর কাউকেই আধুনিক টি-টোয়েন্টির মেজাজে খেলতে দেখা যায়নি এবং দুই ওপেনার দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। রুমানার মতে, ব্যাটিং কোচকে আরও দায়িত্ব নিয়ে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মানের বেসিক ও টি-টোয়েন্টির মেজাজ শেখাতে হবে।
অন্যদিকে, দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির সিদ্ধান্ত ও ব্যাট হাতে চরম ব্যর্থতা সমালোচনার ঝড় তুলেছে। দুবাইয়ের ব্যাটিং-বান্ধব উইকেটে ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে টস জিতে আগে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই ছিল বড় ধরনের কৌশলগত ভুল। এছাড়া ভারতীয় ব্যাটার শেফালি বার্মাকে আটকানোর জন্য জ্যোতির ফিল্ড সেটিং ও বোলিং পরিবর্তন ছিল বড্ড বেশি রক্ষণাত্মক। ফিল্ডারদের ৪টি ক্যাচ মিস, রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া এবং চার নম্বরে নেমে নিজে ১৭ বলে ১৯ রান করার মতো পারফরম্যান্স জ্যোতির নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পুরো এশিয়া কাপে ৪ ম্যাচে ৮৬.১৫ স্ট্রাইক রেটে মাত্র ৫৬ রান করেছেন তিনি। অধিনায়কত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই ঘাটতি নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকেও তাকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
গত বছর নারী ক্রিকেটে তৈরি হওয়া তথাকথিত ‘সিন্ডিকেট’ বা গ্রুপিং প্রসঙ্গে সাবেক অধিনায়ক রুমানা আহমেদ জানান, বর্তমানে দলে সিন্ডিকেটের কোনো সুযোগ বা প্রভাব নেই। কারণ সিনিয়রদের সরিয়ে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া ছিল, তা আগেই সম্পন্ন হয়েছে। এখন সমস্যাটা মূলত খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও ম্যাচ সচেতনতার অভাবে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অনভিজ্ঞ ক্রিকেটারের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিষেকের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ববোধ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বিসিবির নারী বিভাগের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু সেমিফাইনালে দলের এই ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, ভারতের মতো শক্তিশালী দলের ব্যাটারদের সুযোগ দিলে তার মাশুল দিতেই হয় এবং একাধিক ক্যাচ মিসের কারণেই ভারত ১৫০ রান তুলতে সক্ষম হয়েছে। সামনে এশিয়ান গেমস থাকায় আপাতত এই স্কোয়াড বহাল থাকলেও, টুর্নামেন্ট শেষে কোচিং প্যানেল ও পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে বোর্ড গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছে। নতুন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল দায়িত্ব নেওয়ার পর নারী ক্রিকেটারদের বেতন বৃদ্ধি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সত্ত্বেও মাঠে তার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলছে না।