বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের ঠিক পরপরই ভারতের আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক নেমে আসা নিয়ে কূটনৈতিক ও জ্বালানি খাতে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-০১ হুমায়ূন কবীর স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন না। এই ঘোষণার পরদিনই কারিগরি ত্রুটির দোহাই দিয়ে আদানি তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনে। এই ঘটনা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটকে নতুন করে মারাত্মক ও ঘনীভূত করে তুলেছে। ঢাকা ও নয়া দিল্লির চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে এমন পদক্ষেপের টাইমিং নিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনীতিবিদ ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মনে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।
ঘটনাক্রম গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে উভয় দেশের নীতিপ্রণেতাদের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে নানা আলাপ-আলোচনা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়া দিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের বিশেষ আউটরিচ পর্বে না যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, উক্ত সম্মেলনে যোগদান সংক্রান্ত আমন্ত্রণটি সরাসরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন ও ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য একটি 'অনুকূল পরিবেশ' তৈরি হওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশ বরাবরই প্রাধান্য দিয়ে আসছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সেই ঘোষণার ঠিক পরদিনই দেশে হঠাৎ করেই নতুন করে বিদ্যুৎ সংকট চরম আকার ধারণ করে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াটের উৎপাদন ইউনিট কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন হঠাৎ করেই ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে গিয়ে পৌঁছায়। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক কৌশলবিদদের মতে, এই দুই ঘটনার সময়গত অদ্ভুত মিল একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এটি কি কেবলই একটি আকস্মিক কারিগরি বিপর্যয় ও জ্বালানি সংকটের অংশ, নাকি দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দূরত্বের সুযোগে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখে চাপ সৃষ্টির একটি সুপ্রকৌশলী হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে?
যদিও আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নানা অভ্যন্তরীণ জটিলতায় মারাত্মক চাপের মধ্যে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে দেশের বহু অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, ভারতীয় রেলপথের দূরপাল্লার জট এবং কয়লা পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে তাদের গোড্ডা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের সরকারি তথ্যানুযায়ী, আগের রাতে কেন্দ্রটি ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করলেও হঠাৎ একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে উৎপাদন তলানিতে নামে। আদানির প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বয়লার ফিড সিস্টেমে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ইউনিটটি বন্ধ করা হয়েছে এবং সেটি ঠান্ডা করে পুনরায় উৎপাদনে ফেরাতে অন্তত তিন থেকে চার দিন সময় লাগবে।
উল্লেখ্য, আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশ ২০১৭ সালে ২৫ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যই তৈরি ও পরিচালিত হয়ে আসছে। এটি বর্তমান সরকারের সময়কার কোনো চুক্তি নয়, বরং আগের সরকারের আমলে করা দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল রেখেই বাংলাদেশ প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে বিদ্যুৎ কিনে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যেকোনো সংকট বা সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কতটুকু আইনগত দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা গভীরভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত চুক্তিতে একতরফা শর্ত কিংবা বৈষম্য থাকলে তা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করার যৌক্তিক সুযোগ রয়েছে। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম ও বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন যে, বিদেশি একটি একক কেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ সুরক্ষায় একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ামাত্র যদি দেশের জাতীয় গ্রিডে হাজার হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়, তবে দেশের নিজস্ব ব্যাকআপ ব্যবস্থা ও বিকল্প বাফার সংরক্ষণের চরম দুর্বলতা ও সরকারি অব্যবস্থাপনা সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম নীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে কেবল 'ভারতবিরোধী' দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে মূল্যায়ন করা ভুল হবে। বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করেই প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোউইচ পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, কোনো অর্থবহ ও সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ছাড়া বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ভারত সফর করা সমীচীন নয়। উভয় বিশ্লেষকের মতে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রকে আন্তর্জাতিক নীতি ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করতে হবে।
এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তির আইনগত ও প্রযুক্তিগত মূল ভিত্তি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে পারে না, কারণ বাংলাদেশ আদানির কাছ থেকে কোনো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ নেয় না। বাংলাদেশ নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রায় এই বিদ্যুতের চুক্তিভিত্তিক ন্যায্য মূল্য পরিশোধ করে আসছে। ফলে চুক্তিভঙ্গের ঘটনা ঘটলে বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে বাংলাদেশ কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পাবে, সেটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। একই সাথে বাংলাদেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন থেকে দেশের জরুরি পরিষেবাগুলোকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।