সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় প্রধান বাণিজ্যিক শহর জেদ্দা, পবিত্র নগরী মক্কা এবং কৌশলগত পাহাড়ি এলাকা তাইফে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিপদের আশঙ্কায় এক নজিরবিহীন জরুরি সতর্কতা জারি করেছে দেশটির সরকারি কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় জরুরি আগাম সতর্কতা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমগ্র অঞ্চলের বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্কবার্তা ও দিকনির্দেশনা পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রতিবেশী ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান ও রকেট হামলা জোরদার করার পর এই প্রথমবার পবিত্র মক্কা নগরীসহ আশপাশের পুরো অঞ্চল জুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধরনের সর্বোচ্চ আগাম সতর্কতা জারি করা হলো। তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এ খবর জানা গেছে।
জারি করা এই সরকারি সতর্কবার্তায় সংশ্লিষ্ট এলাকার সকল স্থায়ী বাসিন্দা, ওমরাহ পালনকারী, দর্শনার্থী ও বিদেশি নাগরিকদের কোনো ধরনের আতঙ্কে না ভুগে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব ধরনের ঝুঁকি এড়াতে সকলকে সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা ও নির্দেশনাবলী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কঠোরভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। সৌদি সিভিল ডিফেন্স বা বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, তাদের জাতীয় জরুরি আগাম সতর্কতা প্ল্যাটফর্মের ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে এই জরুরি সতর্কবার্তাগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে সম্ভাব্য এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট ধরন বা মাত্রা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য সিভিল ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রকার হুড়োহুড়ি, বিশৃঙ্খলা বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে নিকটস্থ সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থানে চলে যেতে হবে। যদি সম্ভব হয়, তবে যেকোনো ভবনের ভেতরে অবস্থান নেওয়া এবং বিশেষ করে বাইরের জানালা বা বারান্দা থেকে দূরে ভেতরের কোনো সুরক্ষিত কক্ষে অবস্থান নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত সরকারি মাধ্যম থেকে বিপদ কেটে যাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদান করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সবাইকে নিজ নিজ নিরাপদ আশ্রয়েই সতর্কভাবে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খোলা জায়গা, জানালার পাশ, বারান্দা এবং উঁচু ভবনের ছাদে অবস্থান করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকার জন্য বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে পরামর্শ দিয়েছে। যারা জরুরি প্রয়োজনে বা দৈনন্দিন কাজে ঘরের বাইরে বা উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করছেন, সতর্ক সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের নিকটস্থ কোনো সুদৃঢ় ভবনে ঢুকে আশ্রয় নিতে অথবা কোনো মজবুত আড়ালের পেছনে অবস্থান গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
যানবাহনে থাকা গাড়িচালকদের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা জারি করেছে প্রশাসন। এতে বলা হয়েছে, মোবাইলে সতর্কবার্তা পাওয়া মাত্রই কোনো বড় সেতু, ওভারপাস, ফ্লাইওভার বা ঝুঁকিপূর্ণ উঁচু ভবনের নিচ থেকে দূরে কোনো ফাঁকা ও নিরাপদ স্থানে দ্রুত গাড়ি থামিয়ে অবস্থান নিতে হবে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের জনসমাগম, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও সন্দেহজনক স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকা এবং কেবল সরকারি তথ্য মাধ্যম থেকে প্রচারিত সঠিক সংবাদ ও নির্দেশিকা অনুসরণ করার জন্য জনগণের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরবের আইনশৃঙ্খলা ও উদ্ধারকারী বাহিনী।
মূলত সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটেই এই উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হলো। গত কয়েক দিনে হুতি বিদ্রোহীরা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর, বেসামরিক জনপদ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষতিকারক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এসব হামলার জবাবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে অবস্থিত হুতিদের বিভিন্ন কৌশলগত ঘাঁটি ও সামরিক আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান ও তোপ হামলা পরিচালনা করছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী।
সংঘাতের এই ধারাবাহিকতায় লোহিত সাগরের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সৌদির মূল ভূখণ্ডের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনী সর্বোচ্চ তৎপরতা নিশ্চিত করছে। পবিত্র মক্কা নগরী, বাণিজ্যিক কেন্দ্র জেদ্দা এবং পাহাড়ি শহর তাইফে একযোগে এই সতর্কবার্তা জারি করার ঘটনাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকেরা। এর ফলে স্থানীয় অধিবাসী এবং পবিত্র নগরীতে অবস্থানরত লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি রেখেছে সৌদি প্রশাসন।