ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আবহেই চীন সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী এই এক দিনের সরকারি সফরে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বেইজিং পৌঁছাবেন তিনি। সফরকালে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হবেন। এতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম সংঘাতময় পরিস্থিতি, ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা সংকট এবং আঞ্চলিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বিষয়ে বিস্তারিত ও নিবিড় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিংয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চরম গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বেইজিং সফরটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে গত মে মাসে বেইজিংয়ে আরাগচিকে একইভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ওয়াং ই। সে সময়ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে কৌশলগত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে এবারও শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র যাত্রার ঠিক আগমুহূর্তে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেইজিং সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু করার পর বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে বুধবারের বৈঠকটি হবে দ্বিতীয় সরাসরি মুখামুখি বৈঠক। এর আগে গত সপ্তাহের শেষ দিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনেও দুই দেশের এই শীর্ষ কূটনীতিকরা অংশ নিয়েছিলেন। নয়াদিল্লির সেই হাইপ্রোফাইল সম্মেলনের ফাঁকে আরাগচি এবং ওয়াং ইয়ের মধ্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কুশল বিনিময় করতে দেখা গিয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ভবন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং স্পর্শকাতর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক ও ভয়াবহ সামরিক হামলা পরিচালনা করে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সেই আকস্মিক হামলার জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রধান প্রধান সামরিক স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়।
পরবর্তী সময়ে এই হামলা-পাল্টা হামলার সংঘাত কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত ও স্পর্শকাতর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সংঘাতময় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা দিন দিন বৃদ্ধির পাশাপাশি একদিকে যেমন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিস্তার ঘটছে, অন্যদিকে সংঘাত বন্ধে ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক নানা কূটনৈতিক তৎপরতাও সমানতালে অব্যাহত রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই চীন ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে। বেইজিং সর্বদা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি ও সমঝোতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান চরম সামরিক সংঘাত ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মুহূর্তে আরাগচি ও ওয়াং ইয়ের এই বৈঠককে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।