এক
নির্বাচনী প্রচার সমাবেশে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অত্যন্ত সম্মানিত ও জনপ্রিয় নাম
'মোহাম্মদ' নিয়ে প্রকাশ্যে উপহাস ও রসিকতা করেছেন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন রাজনীতির উত্তপ্ত আবহে বক্তব্য রাখার সময় একই মঞ্চ থেকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইরানের প্রেসিডেন্ট পদ নিয়েও কুরুচিপূর্ণ
তামাশা করেন। রাজনৈতিক র্যালি ও নির্বাচনী প্রচারণাগুলোতে
ট্রাম্পের এমন অপ্রীতিকর ও স্পর্শকাতর মন্তব্য
করার পুরোনো অভ্যাস থাকলেও, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতির
সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নাম নিয়ে সরাসরি এমন মন্তব্যে আবারও মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড়
উঠেছে।
মার্কিন
অঙ্গরাজ্য জর্জিয়ার ডালটন মিউনিসিপ্যাল বিমানবন্দর এলাকায় আয়োজিত একটি বিশালাকার বিমানের হ্যাঙ্গারে এই বিতর্কিত সমাবেশের
আয়োজন করা হয়। আগামী ৩ নভেম্বরের অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির
সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে সেখানে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থক ও সাধারণ জনতার
উদ্দেশ্যে ট্রাম্প একটি কাল্পনিক গল্পের অবতারণা করেন। রসিকতার ভঙ্গিতে তিনি বলেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় কিংবা সেখানকার কারও নাম নিয়ে মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে, তবে নিশ্চিন্তে তাকে 'মোহাম্মদ' বলে ডাক দেওয়া যায়। তার দাবি, শুধু 'হ্যালো, মোহাম্মদ' বললেই নাকি শতকরা অন্তত ৬৫ ভাগ সময়
সঠিক নাম অনুমানের সম্ভাবনা তৈরি হয়। একইসঙ্গে নিজেকে জাহির করে তিনি আরও যোগ করেন যে, তিনি গত বহু বছর
ধরে এই কৌশল প্রয়োগ
করে আসছেন এবং এটি নাকি আজও পর্যন্ত কখনো ভুল প্রমাণিত হয়নি।
উল্লেখ্য,
ইসলাম ধর্মের মূল প্রবর্তক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র স্মৃতির
প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিম অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে তাঁদের পুত্রসন্তানদের নাম 'মোহাম্মদ' রেখে থাকেন। ফলে এটি ইসলাম ধর্মে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধেয় একটি
বিষয়।
একই
সমাবেশে মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশেষ করে ইরান নীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানকে উপহাসের পাত্র বানান। হাস্যরসের চেষ্টা করে ট্রাম্প মন্তব্য করেন যে, ইরান নাকি বর্তমান বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে কোনো বিবেকবান মানুষ প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্ব নিতে চায় না। এরপর তিনি কাল্পনিক কয়েকজন 'মোহাম্মদ' নামের ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার ভঙ্গি করে তাদের এই পদে বসার
আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, ২০২৪ সাল থেকে ডেমোক্র্যাটিক ও কূটনৈতিক রাজনৈতিক
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তবে
ট্রাম্পের এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত
রসিকতায় জর্জিয়ার বিমানবন্দরে উপস্থিত দলীয় সমর্থকরাও শতভাগ সাড়া দেয়নি এবং কোনো প্রকার উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে অনেকটাই বিরত ছিল।
ট্রাম্পের
এই অনভিপ্রেত বক্তব্য সামনে আসার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নানা
মানবাধিকার কর্মী এবং মুসলিম অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংগঠনগুলো তার তীব্র ধিক্কার ও সমালোচনা শুরু
করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ট্রাম্প নিয়মিতভাবে তাঁর বক্তব্যে মুসলিম, সাধারণ অভিবাসী এবং কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্যান্য জাতিগত
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন এবং সুযোগ পেলেই পাবলিক প্ল্যাটফর্মে তাদের উপহাস করেন।
চলতি
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণা যতই ঘনিয়ে আসছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের এ ধরনের বিভাজনমূলক
বক্তব্য ততটাই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে সোমালি বংশোদ্ভূত ও মুসলিম আমেরিকানদের
মূল নিশানা বানিয়ে তিনি নানা ধরণের বিতর্কিত উক্তি করছেন। তাঁর এই মৌখিক আক্রমণের
শিকার ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মার্কিন সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ এবং
মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর, যিনি একসময় সোমালি শরণার্থী হিসেবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে
যুক্তরাষ্ট্রে এসে রাজনৈতিক শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
সমাবেশ
থেকে ট্রাম্প আবারও হুঙ্কার দিয়ে তাঁর পুরোনো অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, যেকোনো মূল্যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের সুবিধা অর্জন করা থেকে বিরত রাখা হবে। প্রায় সাত মাস আগে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি পঙ্গু ও স্তব্ধ করে
দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে
দেশটির বিরুদ্ধে জোরালো সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ শুরু
করার পর এ বিষয়ে
তিনি কথা বললেন।
আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর (CAIR)-এর
সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণবাদ চরম
হারে বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে গৃহীত কঠোর অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেসমূহ এবং ফিলিস্তিনপন্থী সাধারণ নাগরিকদের গণবিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করার একমুখী প্রয়াস।