মধ্য আফ্রিকার দেশ সুদানে চলমান রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের নির্মম বলি হলো আরও দেড় শতাধিক প্রাণ। বিতর্কিত আবিয়েই অঞ্চলের একটি জনবহুল বাজারে চালানো ভয়াবহ এক ড্রোন হামলায় শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৫৩ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক হামলায় মুহূর্তেই পুরো বাজারটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার সংঘটিত এই ভয়াবহ হামলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষের মরদেহ সম্পূর্ণ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। এখনো তীব্র উদ্ধারকাজ ও তল্লাশি অভিযান চলমান থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক হামলায় পুরো সুদানে সামগ্রিক নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে আড়াইশ ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যকার ক্ষমতার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত তিন বছরের বেশি সময় ধরে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে।
আবিয়েই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল এনগর রয়টার্সকে জানান, শুরুর দিকে ৭৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে সেই সংখ্যা লাফিয়ে ১৫৩ জনে গিয়ে ঠেকেছে। ভয়াবহ আগুনে কয়েকজনের মরদেহ সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ধারণ করা একটি ভিডিও যাচাই করেছে রয়টার্স। এতে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের আহাজারি করতে দেখা যায়, আর তখনও একটি ভবনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। এই বর্বরোচিত হামলার জন্য সরাসরি সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন এনগর, যদিও তিনি এর সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিনজন কূটনীতিক, একজন ত্রাণকর্মী ও সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানান, এই ড্রোন হামলায় বাজারের একটি প্রধান জ্বালানি ডিপোতে সরাসরি আঘাত হানা হয়। অতীতে এই জ্বালানি ডিপোটি আরএসএফের সেনাদের জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। তবে এই অভিযোগের বিষয়েও আরএসএফের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করা দক্ষিণ সুদান এবং সুদানের মধ্যে তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কর্দোফান অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হলেও বর্তমানে এটি সুদানের চলমান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠেছে। সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে আবিয়েইয়ের কয়েকটি এলাকায় আরএসএফ সক্রিয় রয়েছে, যদিও স্থানীয় মন্ত্রী এনগর সেই উপস্থিতি অস্বীকার করেছেন।
জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী আবিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ) এর আগে সতর্ক করেছিল যে, ওই অঞ্চলে আরএসএফের উপস্থিতির কারণে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক আবিয়েইসহ সুদানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুদানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের ক্ষতি সামলাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর এসব হামলা অত্যন্ত ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় তারা পরপর পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান, যার পরপরই পুরো জ্বালানি বাজারে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। হামলার ভয়াবহতায় প্রায় আট হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, কাছের আমেথ বেক হাসপাতালে আগুনে পোড়া ও মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত ২০ জনেরও বেশি আহত মানুষকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
(সূত্র: রয়টার্স)