রাজীব বিশ্বাস, মাদারীপুর
মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় বোরকা পরিধান করে ককটেল ফাটিয়ে হামলা চালাতে গিয়ে উল্টো ধাওয়ায় ও কুপিয়ে এক হামলাকারী যুবককে হত্যা করার তীব্র অভিযোগ উঠেছে। একই সাথে এই মর্মান্তিক ও সংঘাতময় ঘটনায় অন্তত ৩ জন ব্যক্তি গুরুতর রক্তাক্ত আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের অন্তর্গত কালিগঞ্জ বাজারে সরাসরি এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত যুবকের নাম তাইজুল সরদার (২২)।
তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার ‘চর কুলপদ্বী’ এলাকার মৃত রুস্তুম আলী সরদারের ছেলে। নিহত তাইজুল সরদার হত্যাসহ একাধিক গুরুতর মামলার তালিকাভুক্ত আসামি ছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই সংঘর্ষে আহত অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কালিনগর এলাকার মোতালেব চৌকিদারের দুই ছেলে মহসিন চৌকিদার ও জহির চৌকিদার। অন্যদিকে অপর আহত যুবকের নাম আল আমিন সরদার, যিনি সদর উপজেলার কুলপদ্বী এলাকার বারেক সরদারের ছেলে।
পুলিশ কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, সকালবেলা কালকিনির কালিগঞ্জ বাজারে স্থানীয় হানিফ হাওলাদারের চায়ের দোকানে বসে জহির ও মহসিনসহ অন্যান্যদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক বিতর্কিত চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান মিলন সরদার। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ একটি চলন্ত ইজিবাইকযোগে বোরকা পরিহিত একদল সশস্ত্র যুবক ঘটনাস্থলে এসে বিকট শব্দে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং দোকান থেকে বের করে জহির ও মহসিন নামে দুই ভাইকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে।
পরবর্তীতে সাবেক চেয়ারম্যান মিলন সরদারের সরাসরি নেতৃত্বে স্থানীয় লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে হামলাকারীদের ওপর পাল্টা তীব্র ধাওয়া চালায়। ধাওয়ার মুখে একপর্যায়ে হামলাকারী তাইজুল ও আল আমিনকে ধরে বেধড়ক কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। সংঘর্ষের পর স্থানীয়রা দ্রুত ৪ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মাদারীপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুক্ষণের মধ্যে তাইজুল সরদারের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে জহির ও মহসিন দুই ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ঘটনার বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান মিলন সরদার ইচ্ছা করলেই সংঘাত থামিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতেন। কিন্তু তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে ও নির্দেশে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায় এলাকায় আরও বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা রোধে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর আইনি নজরদারি প্রয়োজন। অন্যদিকে নিহত তাইজুলের চাচা সোবাহান সরদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ তোলেন, ‘সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের সরাসরি নির্দেশেই ১০ থেকে ২০ জন সশস্ত্র লোক আমার ভাতিজাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমরা মিলন ও তার সহযোগীদের ফাঁসি চাই।’
সার্বিক বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এলাকায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার কিংবা তীব্র পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই বোরকা পরা হামলার ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিহত তাইজুল সরদারের লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য জেলা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান মিলন সরদারের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।