পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকার কথা থাকলেও রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি আজ এক অচলাবস্থা ও গভীর সংকটের মুখোমুখি। টানা ১৪ দিন ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের জেরে পর্যটনভিত্তিক এই জনপদে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট ও চরম অর্থনৈতিক স্থবিরতা। একদিকে প্রশাসনিক সংলাপের অচলাবস্থা, অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি—সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দারা।
রাঙামাটির সাজেকে টানা ১৪ দিন ধরে চলমান এই অবরোধের কারণে বুধবারও সাজেক সড়কে কোনো ধরনের যান চলাচল করেনি। অবরোধের ফলে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় জুমচাষিরা। পর্যটননির্ভর যানবাহন চলাচল না করায় ধারদেনা করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন কয়েক শ গাড়িচালক ও সহকারী। ঋণের কিস্তি পরিশোধের দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন গাড়ি মালিকরাও।
চলমান এই অবরোধের প্রতিবাদ ও দাবি আদায়ের অংশ হিসেবে সাজেকে ৪৮ ঘণ্টার পাল্টা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। সংগঠনের সদস্যসচিব বিন্দু লাল চাকমা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, ৪ ও ৫ নভেম্বর এই কর্মসূচি পালিত হবে। এর মধ্য দিয়ে সাজেকের সংকট নিরসনে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যকার সংলাপের উদ্যোগ বর্তমানে ঝুলে গেছে। পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হলেও মূল বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার হয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা এবং সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা যৌথ বিবৃতিতে কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা জানান, উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী বহনকারী যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। এর আগে জরুরি প্রয়োজনে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী গাড়ি, ধর্মীয় ও বিবাহ অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত গাড়ি এবং সাংবাদিকদের গাড়ির ক্ষেত্রেও বিশেষ শিথিলতা রাখা হয়েছিল। তবে সাজেকবাসীর পাঁচ দফা ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়।
টানা এই অবরোধের কারণে সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জানিয়েছেন, পর্যটকশূন্যতার ফলে সাজেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সাজেকে ১১৬টির বেশি রিসোর্ট, ১৪টি রেস্তোরাঁ ও শতাধিক ছোট-বড় দোকান রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই অবরোধের কারণে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা পুঁজি হারিয়ে ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা ও শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও ইউপি সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরা জানিয়েছেন, স্থানীয়দের ঘরে মজুত খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস শেষ হয়ে গেছে। ওষুধপত্রসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানিয়েছেন, নতুন করে বৈঠকের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, সড়কে বড় কোনো গাড়ি চলছে না এবং পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে। সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো আশানুরূপ ফল আসেনি। খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানিয়েছেন, দেড় হাজারের বেশি যানবাহন বন্ধ থাকায় চালক-শ্রমিকরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।