আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নগরায়ণ ও পরিকল্পিত আবাসন বাস্তবায়নে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি প্রতিষ্ঠান। তবে নিয়মনীতি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থাটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়সম নানা চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। খোদ রাজউক চেয়ারম্যানের বাসভবন (বাংলো) সংস্কারের নামে বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সংস্থাটির সার্বিক স্বচ্ছতা ও পরিচালনা পদ্ধতিকে চরম প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে—তা নিয়ে এখন দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে
জানা যায়, রাজউক চেয়ারম্যানের
বাংলো সংস্কারে প্রকৃত ব্যয় যেখানে ৩০
লক্ষ টাকার বেশি হওয়ার কথা
নয়, সেখানে প্রায় ৩ কোটি টাকার
বিশাল বিল তৈরি ও
তা পাস করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার উন্মুক্ত
দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান
করা হয়নি। কোনো রূপ নিয়মমাফিক
যাচাই-বাছাই ছাড়াই নির্দিষ্ট এক ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে
এই কাজ বরাদ্দ দেওয়া
হয়। সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনিয়মভিত্তিক
এই ব্যয় অনুমোদন এবং
মোটা অঙ্কের অর্থ লোপাটে রাজউকের
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মজিব এবং প্রধান
নগর স্থপতি মুস্তাক আহমেদের ভূমিকা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন
উঠেছে। প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টদের মতে, তাদের সরাসরি
সম্মতি ও স্বাক্ষর ছাড়া
এ ধরনের বিশাল টাকার ভুয়া বিল ছাড়
হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। এই দরপত্রবিহীন
অবৈধ ব্যয়ের বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
রাজউকের
আরেক আলোচিত চরিত্র পরিচালক রাজিয়া সুলতানা, যার বিরুদ্ধে ক্ষমতার
অপব্যবহার করে শত কোটি
টাকার সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি
উপ-পরিচালক হিসেবে সংস্থায় যোগ দেওয়ার পরই
সরকারের কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া
বেআইনিভাবে লন্ডন ভ্রমণ করেন। সরকারি কর্মকর্তা হয়ে বিনা অনুমতিতে
বিদেশ ভ্রমণ শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল, আর ঠিক এই
ঘটনার পরই তাঁর দুর্নীতি
ও ক্ষমতার অপব্যবহার আরও বেড়ে যায়।
রাজধানীতে
বিভিন্ন নকশা বহির্ভূত বা
সামান্য ত্রুটি থাকা ভবনের মালিকদের
মামলা ও ইমারত ভাঙার
ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা
হাতিয়ে নেওয়া ছিল তাঁর নিয়মিত
কাজ। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জোনে কর্মরত থাকাকালে
রাজউকের খাস জমি ও
পরিত্যক্ত সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের নামে
বরাদ্দ দেওয়ার বিনিময়ে তিনি কোটি কোটি
টাকা হাতিয়ে নেন এবং বিপুল
অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েন। বারবার অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ তদন্তের
মুখোমুখি হলেও রাজিয়া সুলতানার
বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক
ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাঁকে উপ-পরিচালক থেকে
পদোন্নতি দিয়ে পরিচালক পদে
উন্নীত করা হয়েছে, যা
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে তীব্র
ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাঁর
বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি
সদুত্তর না দিয়ে বিষয়টি
এড়িয়ে যান এবং মুঠোফোনে
তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
একজন
অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মী
হিসেবে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে
রাজউকের দুর্নীতির এক ভয়ংকর বাস্তব
চিত্র তুলে ধরা সম্ভব।
মধ্য বাড্ডা এলাকার গ-৫৮ হোল্ডিংয়ে
সম্পূর্ণ নকশাবহির্ভূতভাবে একটি বিশাল ৯
তলা ভবন অবৈধভাবে নির্মাণ
করা হয়েছে। রাজউকের বিভিন্ন চিঠিপত্র ও নোটিশে খোদ
স্বীকার করা হয়েছে যে
ভবনটি অবৈধ এবং এর
বর্ধিত অংশ ভেঙে ফেলার
জন্য চূড়ান্ত নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার মহাখালী জোনের ইমারত পরিদর্শক বা কর্মকর্তারা জানিয়ে
দেন যে, ওপরের নির্দেশ
রয়েছে—চেয়ারম্যান স্যারের কথা অনুযায়ী এই
নকশাবহির্ভূত বাড়ি ভাঙা যাবে
না, কারণ এখানে বড়
ধরনের তদবির রয়েছে। তবে সাংবাদিক আব্দুল
কাইয়ুম খান যেহেতু এ
নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাই অফিসিয়াল নিয়মরক্ষার
খাতিরে একটি আবেদন দিতে
বলা হয়।
পরিস্থিতি
আরও চাঞ্চল্যকর হয়ে ওঠে যখন
দেখা যায়, আদালতের সুনির্দিষ্ট
রায় থাকা সত্ত্বেও ওই
বাড়ির মালিকরা সাংবাদিক আব্দুল কাইয়ুম খানের চার ফুট জায়গা
জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন।
তাদের জমির দলিলের সঙ্গে
নকশায় প্রদর্শিত জমির পরিমাণের মধ্যে
প্রায় আধা শতাংশ বেশি
জমি অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে—যা অত্যন্ত রহস্যজনক।
কোনো ধরনের বৈধ দলিল বা
সরকারি ছাড়পত্র ছাড়াই পাঁচতলা ভবন নির্মাণের পর
কীভাবে হঠাৎ করে নকশা
পাস করানো হলো, তা নিয়ে
বড় ধরনের দুর্নীতির গন্ধ রয়েছে। ১২
ফুট রাস্তার ওপর ৯ তলা
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী যে পরিমাণ জমি
রাস্তা বা ওপেন স্পেসের
জন্য ছাড় দেওয়ার কথা,
বাস্তবে তার এক ফুট
জায়গাও ছাড় করা হয়নি।
তা সত্ত্বেও ওই অবৈধ নকশাবহির্ভূত
ভবনটি রক্ষা করতে সর্বনিম্ন পরিদর্শক
থেকে শুরু করে রাজউকের
সর্বোচ্চ পদের কর্মকর্তারা পর্যন্ত
একজোট হয়ে চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছেন। এই একটি ঘটনাই
প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট
যে রাজউক আদ্যোপান্ত একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে
পরিণত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির
দুর্নীতির ব্যাপ্তি কতটা গভীরে, তা
অনুমান করা যায় সাবেক
সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল মালেকের শত কোটি টাকার
মালিক বনে যাওয়ার খবরে।
সর্বনিম্ন কর্মী থেকে শুরু করে
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত অনেকেই আজ দুর্নীতির সাম্রাজ্য
গড়ে তুলেছেন। তাছাড়া এই প্রতিষ্ঠানে কোনো
দুর্নীতির ফাইল বা নথিপত্র
চাইলে বলা হয় ফাইল
পাওয়া যাচ্ছে না। অতীতে এই
প্রতিষ্ঠান থেকে একাধারে ২২
হাজার সরকারি ফাইল গায়েব হওয়ার
চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। নকশাবহির্ভূত অবৈধ ভবন বা
স্থাপনা টিকিয়ে রাখতে সর্বস্তরের কর্মকর্তারা যেভাবে সিন্ডিকেট চালিয়ে যাচ্ছেন, তার ভুক্তভোগী বহু
সাধারণ মানুষ।
আমাদের
সুনির্দিষ্ট দাবি
রাজধানী
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এই লাগামহীন অনিয়ম
ও দুর্নীতি রোধে অবিলম্বে দুর্নীতি
দমন কমিশনের (দুদক) জোরালো হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো হলো—
১.
পরিচালক রাজিয়া সুলতানার লন্ডন ভ্রমণের সরকারি অনুমোদন পররাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
থেকে যাচাই করা হোক।
২.
নারায়ণগঞ্জ জোনে তাঁর দায়িত্বকালীন
সময়ে দেওয়া সকল প্লট বরাদ্দ
ও নকশা অনুমোদনের ফাইল
জব্দ করা হোক।
৩.
রাজিয়া সুলতানার শত কোটি টাকার
অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজতে তাঁর
ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর সম্পত্তি
দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করা হোক।
৪.
চেয়ারম্যানের বাংলো সংস্কারের ৩ কোটি টাকার
বিলের ফাইল জব্দ করে
নিরপেক্ষ অডিট চালানো হোক
এবং প্রকৌশলী রাহাত মজিব ও স্থপতি
মুস্তাক আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।
৫.
সাবেক সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল মালেকসহ রাজউকের সন্দেহভাজন সকল কর্মকর্তার আয়ের
উৎস ও সম্পদের হিসাব
নেওয়া হোক।
৬.
মধ্য বাড্ডার গ-৫৮ হোল্ডিংয়ের
অবৈধ ৯ তলা ভবন
নির্মাণে যারা জড়িত এবং
যারা ফাইল জালিয়াতি বা
তদবিরের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা
গ্রহণ করা হোক।
রাজউকের
চেয়ারম্যানের বাংলো সংস্কারের নামে যে পরিমাণ
রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট হয়েছে,
তা প্রমাণ করে প্রতিষ্ঠানটির রন্ধ্রে
রন্ধ্রে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। এই
অবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায়
আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ
প্রজন্ম একটি স্বচ্ছ ও
পরিকল্পিত রাজধানী উপহার পায়।
রাজধানী
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যানের বাসভবন বা বাংলো সংস্কারের
নামে লাখ টাকার কাজে
কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের ঘটনা
এবং নকশাবহির্ভূত অবৈধ ভবন রক্ষায়
খোদ চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র
সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সংস্থাটির প্রধান নিজেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, সেখানে সুশাসন ও আইনকানুন বাস্তবায়নের
আশা করা যায় না।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদে থেকে এ
ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি কোনোভাবেই
গ্রহণযোগ্য নয়।
অতএব,
রাজউকের সার্বিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং অনিয়মের
এই পাহাড় গুঁড়িয়ে দিতে অবিলম্বে গৃহায়ন
ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।