দলের কিছু সমর্থক মনে করছেন, ডিসেম্বর ২০২৫ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তই তাদের ভোট কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এ সিদ্ধান্তে অনেক তরুণ ভোটার মনে করেছেন, এনসিপি তাদের বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ যে আশা ও স্বপ্ন দেখেছিল, এনসিপি তা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে জোট আমাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো লেগেছে। আমাদের মতো অনেক তরুণ ভোটার তাই তাদের সমর্থন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
এনসিপির এই ফলাফলের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখাচ্ছেন, তরুণ ভোটাররা নতুন রাজনৈতিক ধারার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, “এই জোট তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, যারা নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রত্যাশা করেছিল। নতুন কিছু শুরু করার পরিবর্তে অনেকেই এটিকে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখেছেন। এই সিদ্ধান্ত তরুণ ভোটকে বিভক্ত করেছে এবং তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও শাসনক্ষম মনে হওয়া বিএনপির প্রতি সমর্থন বাড়িয়েছে।”
নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ২৯৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয়ী হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি দুই দশক পর ফের সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব এখন তার ছেলে তারেক রহমানের হাতে। তিনি দলের প্রধান হিসেবে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে ৬৮টি আসন পেয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যান্য শরিকরা ৯টি আসন অর্জন করেছে। এনসিপির ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে, বিএনপি ও জামায়াতের জোট শক্তিশালী অবস্থান পেয়েছে।
গণভোটের ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন। এছাড়া বাতিল করা ব্যালট পেপারের সংখ্যা ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭। গণভোটে এই বিপুল সংখ্যক অংশগ্রহণ জনগণের পরিবর্তনের প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কারের চাওয়ার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা একদিকে এনসিপির সাথে জামায়াতের জোটকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছে, অন্যদিকে বিএনপি-জোটকে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর সরকারের সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই ভোটবিভাজন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তরুণদের রাজনৈতিক চেতনার পরিচায়ক।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তরুণ ভোটারদের রায় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তারা নতুনত্ব ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের পক্ষে। সোহানুর রহমান জানান, “আমরা চাই নতুন কিছু হোক, পুরনো পদ্ধতি নয়। আমাদের ভোট দিয়ে এটা দেখিয়েছি।”
নির্বাচনের ফলাফল দেশীয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, যুবসমাজের ভোটের প্রভাব আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল পরিবর্তনের নির্দেশ দেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির ভরাডুবি থেকে শিক্ষা নিয়ে যুবভিত্তিক দলগুলো নতুন নীতি ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।
বিএনপির জয় এবং গণভোটে জনগণের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দেশের যুবসমাজ এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।