ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৯০ দিন বাড়ল ডাকসুর সময়সীমা, তফসিল ঘোষণাতেই বাতিল হবে কমিটি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১৬ ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫৯৩ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি কিম জং উনের ছেলে সন্তান ঘিরে রহস্য, উত্তরসূরি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তর্ক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ডিএসসিসি কার্যালয়ে প্রশাসকের ঝটিকা পরিদর্শন জ্বালানি হামলা বন্ধের প্রস্তাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কী বলল মস্কো? পবিত্র মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে জরুরি সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব ৭ জনের ফাঁসির রায়ে ককটেল বিস্ফোরণ বড় বিষয় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনায় শুধুই ইসরায়েল

সংঘাতের উত্তাপে পুড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলো


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬ সময় : ৩:১৯ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো একের পর এক আঘাতের মুখে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশগুলো মনে করছে, তারা ইরানের হামলা থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তায় ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে একটি স্পষ্ট অগ্রাধিকার ব্যবস্থা বা ‘স্তরভেদ’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ইরানের এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, বেসামরিক এলাকা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। উপসাগরীয় দেশগুলো, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বা যাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, তারা এই হামলার তীব্রতা ও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি ইরাকেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।

তেহরান ইসরায়েলের ওপরও হামলা চালিয়েছে। তবে কিছু হামলার রুট আজারবাইজান ও তুরস্কের আকাশসীমা অতিক্রম করেছে। ইরান দাবি করেছে, ইসরায়েল ভুয়া হামলার মাধ্যমে (‘ফলস ফ্ল্যাগ’) পরিস্থিতি অস্থির করে আরব দেশগুলোকে যুদ্ধের দিকে টানার চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন স্কুলছাত্রী রয়েছেন।

নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনা থাকা সত্ত্বেও অনেক উপসাগরীয় দেশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা নেনি। কিছু আরব কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই এর জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নয়। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি কিছু উপসাগরীয় কর্মকর্তা চুক্তি পুনর্বিবেচনার কথাও ভাবছেন।

সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আহমদ আল-হাবতুর এই সংঘাতকে ‘নেতানিয়াহুর যুদ্ধ’ বলে সমালোচনা করেছেন। তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অস্ত্র শ্রেণিবিন্যাস’ বা অগ্রাধিকার নীতি অনুসরণ করছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ও আইন অধ্যাপক জর্জ বিশারাত বলেন, ‘ইসরায়েল প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক অনুদান পায়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র যেমন পরিবর্তিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহারেরও সুযোগ পায়।’

তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কাঠামোগত, আর উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মূলত বাণিজ্যিক। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনে, যা অনুদান নয়, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং শর্তসাপেক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যে অস্ত্র সরবরাহ করছে, তার বেশিরভাগই সামরিক সহায়তার অংশ। প্রতি বছর ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরও ৬.৬৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে গত সপ্তাহে ১৫১.৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়।

ইসরায়েলকে দেওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, নির্ভুল লক্ষ্যভেদী বোমা এবং হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র। এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং জরুরি গোলাবারুদ কেন্দ্রও যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে। এছাড়া আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং ও অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এই ধরনের বহুস্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা সুবিধা পায়নি।

উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনে থাকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের কাছে ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়। ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ১৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি হয়। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনও কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। তাদের কাছে এফ-১৫, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং থাড সিস্টেম সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পায়নি।

জিসিসি দেশগুলোতে ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল আমিরাত ও সৌদি আরবে বিমানঘাঁটি, বন্দর, হোটেল, আবাসিক এলাকা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তেলক্ষেত্র। কাতারে মেসাইয়িদ ও রাস লাফান শিল্পনগরী ও তেল–গ্যাস স্থাপনা, বাহরাইনে মিনাস সালমান নৌবহরের সদরদপ্তর, কুয়েতে আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি হামলার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইউক্রেনের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধে ইউক্রেন ড্রোন যুদ্ধ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো চাইলে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে প্রস্তুত।

সংঘাত বিশেষজ্ঞ সুলতান বারাকাত মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধের ঝুঁকি জানলেও উপসাগরীয় দেশগুলোকে কার্যত বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে। যদি তারা সরাসরি প্রতিশোধ নেয়, পুরো অঞ্চল বহু বছরের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

মোটের ওপর, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় সমর্থন ইরান ও ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি নতুন বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে, যা সামনের মাসগুলোতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

  আকশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর