ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৯০ দিন বাড়ল ডাকসুর সময়সীমা, তফসিল ঘোষণাতেই বাতিল হবে কমিটি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১৬ ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫৯৩ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি কিম জং উনের ছেলে সন্তান ঘিরে রহস্য, উত্তরসূরি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তর্ক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ডিএসসিসি কার্যালয়ে প্রশাসকের ঝটিকা পরিদর্শন জ্বালানি হামলা বন্ধের প্রস্তাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কী বলল মস্কো? পবিত্র মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে জরুরি সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব ৭ জনের ফাঁসির রায়ে ককটেল বিস্ফোরণ বড় বিষয় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত দাবার বোর্ড সাজিয়েছে ইরান ও চীন


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৮ মার্চ, ২০২৬ সময় : ১:১৮ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ঘিরে ইরান ও চীন যে কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা অনেক বিশ্লেষকের চোখে এক জটিল দাবার বোর্ডের মতো। এখানে প্রতিটি চাল শুধু সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক—সব দিক থেকেই হিসাব করে নেওয়া। তথ্যসূত্র দ্য ক্রেডলের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সংঘাতে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে দুই সমান্তরাল পথে—একদিকে কূটনৈতিক ভাষ্য, অন্যদিকে সামরিক বার্তা।

এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, বেইজিং এই সংঘাতকে কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে দেখছে না; বরং এটি তাদের কাছে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চীনের সামরিক মুখপাত্র, পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একজন কর্নেল, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধে আসক্ত’ একটি রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছর তারা প্রকৃত শান্তিতে ছিল।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু সামরিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং একটি নৈতিক সংকটাপন্ন শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। চীনের এই অবস্থান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মার্ক্সবাদ ও কনফুসীয় চিন্তাধারার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি বিকল্প রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।

কনফুসিয়াসের দর্শনে ভাষার সুনির্দিষ্ট ব্যবহার এবং নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীন সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক সমালোচনা গড়ে তুলছে। তাদের বক্তব্য—এই যুদ্ধ এমন একটি শক্তির উদ্যোগ, যারা নিজেদের নৈতিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলেছে। এই বার্তা বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, ময়দানের বাস্তবতায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীন প্রযুক্তিগতভাবে ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধের নিয়মই অনেকাংশে বদলে গেছে। ইরানের কৌশলগত নেটওয়ার্ক এখন চীনের বাইদু স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। কক্ষপথে থাকা ৪০টিরও বেশি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি হয়েছে, যা শত্রুপক্ষের নজরদারি ও জ্যামিং প্রচেষ্টাকে অনেকাংশে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।

এর ফলে ইরান এখন আরও নির্ভুলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারছে। দ্রুত লক্ষ্য নির্ধারণ, সংকেত বিঘ্ন প্রতিরোধ এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সক্ষমতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চীনের সরবরাহ করা দীর্ঘপাল্লার রাডার এই স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

রাশিয়াও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অর্জিত অভিজ্ঞতা ইরানের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়েছে। এর ফলে ইরান শুধু ড্রোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত আক্রমণ কৌশল রপ্ত করেছে। এই সমন্বিত হামলা শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

অপারেশন ট্রু প্রমিস ফোরের সর্বশেষ ধাপে এই কৌশলের বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইরান শুধু প্রতিরোধই করছে না; বরং পাল্টা আঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

তবে এই পুরো কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামরিক নয়—অর্থনৈতিক। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান এখন কেবল সেই তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যেগুলোর লেনদেন পেট্রো-ইউয়ানে সম্পন্ন হচ্ছে। অর্থাৎ ডলার বা ইউরোর বদলে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

এই পদক্ষেপ সরাসরি পেট্রোডলার ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানছে, যা ১৯৭৪ সাল থেকে বৈশ্বিক তেলবাণিজ্যের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। সে সময় জিসিসি ও ওপেক দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তেলের লেনদেন শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে হবে। এর ফলে ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।

কিন্তু এখন সেই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে পেট্রো-ইউয়ান। চীন ইতিমধ্যেই বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেমন আন্তসীমান্ত আন্তব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)। ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এখন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে।

এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত পরিবর্তন। এর মাধ্যমে চীন ও ইরান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমানোর চেষ্টা করছে। গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ এই মডেল অনুসরণ করতে আগ্রহী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এই পরিকল্পনায় অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি—সবই এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি চীনকে শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। আর ইরানের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

হরমুজ প্রণালি, যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়, সেটিকে এখন ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সরাসরি অবরোধ নয়; বরং শর্তসাপেক্ষ নিয়ন্ত্রণ। যারা পেট্রো-ইউয়ানে লেনদেন করবে, তারাই এই পথ ব্যবহার করতে পারবে।

এই কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ‘আর্থিক পারমাণবিক অস্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। কারণ এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পুরো প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষকরা দাবা ও ‘গো’ খেলার সঙ্গে তুলনা করছেন। ইরান যেখানে তাৎক্ষণিক কৌশলগত চাল দিচ্ছে, সেখানে চীন দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করছে। ‘গো’ খেলায় যেমন ধৈর্য ও ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চীনও ধীরে ধীরে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করছে।

ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন, নতুন সিল্ক রোড—এসব উদ্যোগ সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিকল্প আর্থিক কাঠামো নির্মাণ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা—সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বেইজিং।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা। যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি এবং আদর্শ—সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান ও চীনের যৌথ কৌশল, যা ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

লেখক: পেপে এসকোবার, দ্য ক্রেডলের কলামিস্ট, এশিয়া টাইমসের এডিটর অ্যাট লার্জ এবং ইউরেশিয়া–বিষয়ক একজন স্বাধীন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।


এ সম্পর্কিত আরো খবর