২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামী মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল)। তবে এবারের পরীক্ষাকে ঘিরে একটি উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে—দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এবারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে মোট ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন নিবন্ধন করেছিল। কিন্তু এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছে মাত্র ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এই দুই বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার বাইরে চলে গেছে।
অন্যদিকে, নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থী মিলিয়ে এবারের মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৭৯ হাজার ২৩৫ জন।
এই পরিসংখ্যান শিক্ষা খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন কারণে ঝরে পড়ছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, কেন এত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। তিনি বলেন, গত বছর অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ একটি বড় কারণ ছিল।
শিক্ষা বোর্ড সূত্রে আরও জানা গেছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৩ জন। কিন্তু এর মধ্যে এবারের এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে ১১ লাখ পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। ফলে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে থেকে গেছে। এদের কেউ ঝরে পড়েছে, কেউবা আগের শ্রেণিতে থেকে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। দুই বছর আগে এখানে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু এবারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ২ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও অনুরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুই বছর আগে প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধন করলেও এবারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এক লাখ ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা, বাল্যবিবাহ, কর্মসংস্থানের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এ সমস্যা বেশি প্রকট।
এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। মোট চার লাখের বেশি অনিয়মিত পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে এক বিষয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। বাকিরা দুই, তিন, চার বা সব বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা দিচ্ছে।
মোট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে ১৪ লাখ ১৮ হাজারের বেশি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৩ লাখের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী রয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি।
এবার সারা দেশে মোট ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা। তাই এ পরীক্ষাকে ঘিরে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এত বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। এর কারণ নির্ণয় করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থায় আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধ, আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।
আকাশজমিন / আরআর