দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একযোগে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র সংখ্যা ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। ২০২৫ সালে এসএসসি, দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন। সেখানে ২০২৬ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৭১ হাজার ৬২৬ জন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার পেছনে নানা সামাজিক ও শিক্ষাগত কারণ থাকতে পারে।
বোর্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বোর্ডে এবারও সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। ২০২৫ সালে যেখানে পরীক্ষার্থী ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৮৫ জন, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫০ জনে। একইভাবে রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম ও সিলেট বোর্ডেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে ময়মনসিংহ বোর্ডে, যেখানে ২০২৫ সালের তুলনায় পরীক্ষার্থী বেড়েছে। গত বছর ১ লাখ ৬ হাজার ৮২৫ জন পরীক্ষার্থী থাকলেও এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৩৫৯ জন।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৬ সালে এ বোর্ডে পরীক্ষার্থী দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন, যা ২০২৫ সালের ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জনের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত বছর ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩১৩ জন পরীক্ষার্থী থাকলেও এবার তা কমে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জনে নেমে এসেছে।
গ্রুপভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর অধীনে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিচ্ছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৬৩ জন শিক্ষার্থী। মানবিক বিভাগে রয়েছে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৪৫১ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে অংশ নিচ্ছে ২ লাখ ২১ হাজার ১৮৪ জন শিক্ষার্থী। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মানবিক বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, কিছু বিভাগে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বেশি। মানবিক বিভাগে ছাত্রী সংখ্যা ৩ লাখ ৬১ হাজার ১৬৯ জন, যেখানে ছাত্র রয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ২৮২ জন। বিজ্ঞান বিভাগেও ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় বেশি। তবে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছাত্রদের অংশগ্রহণ বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সাধারণ বিভাগে অংশ নিচ্ছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৩২০ জন এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৪১ হাজার ৫২১ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৯৮ জন এবং দাখিল (ভোকেশনাল) কোর্সে ২ লাখ ৪৬২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।
পরীক্ষা সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে শিক্ষা প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। পরীক্ষার আগে ও পরে যেকোনো ধরনের অনিয়ম রোধে কেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। কেন্দ্র সচিবের কক্ষ থেকে সরাসরি মনিটরিংয়ের পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ড থেকেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বা কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শুধুমাত্র কেন্দ্র সচিব একটি সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে অভিভাবক বা বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র বহন ও বিতরণের ক্ষেত্রে ‘লকিং সিস্টেম’ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম ঘটতে না পারে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেছেন, একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা আয়োজনই তাদের লক্ষ্য। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম মাঠে কাজ করছে। কোনো ধরনের নকল বা প্রশ্ন ফাঁসের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে পরীক্ষার আগে থেকেই শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সম্ভাব্য ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন সময় তিনি হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন কেন্দ্রে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে নকল প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে কারণে তিনি ‘হেলিকপ্টার মিলন’ নামে পরিচিতি পান। এবারও অনিয়ম রোধে তিনি যেকোনো সময় দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে হঠাৎ উপস্থিত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবারের পরীক্ষার্থীরা করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারেনি। ফলে এটি তাদের জীবনের প্রথম পূর্ণ সিলেবাসের পাবলিক পরীক্ষা। তাই পরীক্ষার পরিবেশ শিক্ষার্থীবান্ধব রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারই এবারের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছে। প্রশ্নপত্রে কোনো ধরনের জটিলতা থাকলে তা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অযথা কঠোরতা না দেখানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সরকার চায় পরীক্ষার্থীরা যেন কোনো ধরনের মানসিক চাপ ছাড়াই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। ‘পরীক্ষা ভীতি’ দূর করে একটি আনন্দময় পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই শিক্ষার্থীরা করোনার কারণে আগের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো দিতে পারেনি, তাই এসএসসি তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, ফ্যান, বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাস্থ্যকর টয়লেট নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আইপিএস বা জেনারেটরের বিকল্প ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সমন্বিত প্রস্তুতি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার ফলে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। পরীক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং কোনো ধরনের অনৈতিক পন্থা অবলম্বন না করে নিজেদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করে।