বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় আপাতত বড় কোনো সংকট না থাকলেও ‘জরুরি সরবরাহ’ হিসেবে ঘোষিত নতুন উৎস থেকে এখনো কোনো তেল আসেনি। সরকারের নেওয়া বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি তেল কেনার উদ্যোগ দুই মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তব সরবরাহ শুরু না হওয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠার পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে নতুন উৎস থেকে তেল কেনার উদ্যোগ নেয়। এই প্রক্রিয়ায় ৫৬টি বিদেশি কোম্পানি আবেদন করে, যার মধ্যে ৮টি কোম্পানি কাজ পাওয়ার অনুমোদন পায়। তবে এখন পর্যন্ত এসব কোম্পানির কেউই বাস্তবভাবে তেল সরবরাহ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ডিজেলের চাহিদা ৩ লাখ ৭০ হাজার টন হলেও দেশে মজুত আছে প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার টন। একই সময়ে ৩ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল আমদানি আসার কথা রয়েছে। অকটেনের ক্ষেত্রে চাহিদা ৩৭ হাজার টন, যেখানে মজুত আছে ৪২ হাজার ৯৩৩ টন। স্থানীয় উৎস থেকে ২৪ হাজার টন এবং আমদানি থেকে আরও ২৬ হাজার টন অকটেন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিপিসি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় কমে এসেছে এবং বাজারে চাপ নেই। মে মাসের শুরুতেই অপরিশোধিত তেলের একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, পাশাপাশি আরও দুটি জাহাজ আসার আলোচনা চলছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—‘জরুরি সরবরাহ’ হিসেবে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এখনো কোনো তেল দেশে আসেনি। যদিও সরকারের অনুমোদনে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আনার প্রক্রিয়া চলছে, বাস্তব সরবরাহ এখনো শুরু হয়নি।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল এবং অকটেন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কয়েকটি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্র, কাজাখস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল সরবরাহের কথা বললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সরবরাহ শুরু হয়নি।
একটি কোম্পানিকে এক লাখ টন ডিজেল সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা না দেওয়ায় সেই চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে। ফলে জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি সংকট নেই এবং ভবিষ্যতেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে, যাতে স্থায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার মধ্যে এমন বড় পরিমাণ আমদানি নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়ার কারণে সরবরাহ বিলম্ব হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের ঘাটতি না থাকলেও ‘জরুরি উৎস’ থেকে সরবরাহ শুরু না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংকটের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।