ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম নাটোরে প্রবাসীর শপিং মলে হামলা ও লুটপাট, ৫ কোটি টাকার ক্ষতি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায় না বিএনপি সরকার: প্রতিমন্ত্রী তিন নিরাপত্তারক্ষীসহ অপহৃত কালাতের রাজপুত্র শাহজাদা আহমেদজাই 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' শব্দ নিষিদ্ধের ঘোষণা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী পরীক্ষকের সামনে পুরুষরা কম ব্যথা অনুভব করেন: নতুন গবেষণা উইন্ডিজের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই মুশফিক! কাঁদুনে গ্যাসে ফরাসি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ, দাবি বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ফেনারবাখচেকে হারিয়ে ইউরোলিগে ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত জয়

অনিয়ম ও খেলাপির ধাক্কায় চরম আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১০:২৩ এএম

দেশের ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, লাগামহীন ঋণ জালিয়াতি এবং ব্যাপকভাবে অর্থ পাচারের ভয়াবহ ধাক্কা এখন বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় নামে-বেনামে প্রভাবশালীদের নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণের একটি বড় অংশ ফেরত না আসায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকিং খাতের আইনি নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।


কিন্তু আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের বিশাল পাহাড় জমার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না অনেক ব্যাংক। এর ফলে চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অন্তত ১৫টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে একসঙ্গে এত বড় অঙ্কের নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি পুরো আর্থিক খাতের মারাত্মক ভঙ্গুরতা ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শীর্ষ পাঁচটি প্রধান ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোতে সব মিলিয়ে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক।

 

একক ব্যাংক হিসেবে এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা, যা সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঘাটতির সিংহভাগ। এর পরেই বিপুল অঙ্কের নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি নিয়ে মারাত্মক আর্থিক চাপে ধুঁকছে অগ্রণী ব্যাংক, যার ঘাটতির পরিমাণ ১২ হাজার ৩ ৩৮ কোটি টাকা। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখার মতো পর্যাপ্ত ব্যাকআপ তহবিল না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ মূলধন ভিত্তি চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

অপরদিকে বেসরকারি খাতের চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেসরকারি ১০টি ব্যাংকে নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক অতিক্রম করেছে। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার বিশাল সঞ্চিতি ঘাটতি নিয়ে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। একসময় দেশের অন্যতম শক্ত ভিত্তির এই ব্যাংকের এমন ধস পুরো ব্যাংক খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এছাড়া অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও সঞ্চিতি ঘাটতির মাত্রা আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৯ ৪ কোটি টাকা। একইভাবে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এছাড়া অন্য ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে মার্কেটাইল ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ঘাটতি ৮২০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৬৪৫ কোটি টাকা এবং এনআরবি ব্যাংকের ঘাটতি ১৩০ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের অনিয়ন্ত্রিত ঘাটতি সামগ্রিক বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

ব্যাংক খাতের এই অভূতপূর্ব নজিরবিহীন সংকটের মূল কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতা ও খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ব্যাংক খাতের মূল ব্যাধিই হলো খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে প্রভিশন ঘাটতি নিয়ে এমন ভয়াবহ সংকট তৈরির কোনো সুযোগ থাকত না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বারবার নানা নীতিগত ছাড় দেওয়া এবং ঘাটতি থাকার পরও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ রাখার মতো বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের কারণে পুরো ব্যাংকিং খাতে চরম ভুল বার্তা গেছে।

 

ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের আত্মঘাতী নীতি অব্যাহত রাখার চূড়ান্ত পরিণতি হলো সাধারণ আমানতকারীদের জমানো অর্থকে সরাসরি চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই অনতিবিলম্বে এ জাতীয় ক্ষতিকর ও নমনীয় নীতিমালা সম্পূর্ণ বাতিল করে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় ঋণ আদায় বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর তাগিদ দেন এই জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। শতকরা হিসেবে পুরো ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা খেলাপিতে আটকে গেছে, যার একটি বিশাল অংশ প্রায় আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণে রূপ নিয়েছে।

 

বিদ্যমান এই গভীর আর্থিক সংকটের পেছনের কারণ তুলে ধরতে গিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান জানান, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মূলত লুটপাটের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন এবং বছরের পর বছর পার হলেও সেই টাকা ফেরত দেননি। বিপরীতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকও এসব প্রভাবশালী খেলাপিদের বারবার পুনর্গঠন, পুনঃতফসিলসহ নানা অসংগত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে এসেছে।

 

এর ফলে দেশে ঋণ নিয়ে তা শোধ না করার এক ভয়াবহ অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের চরম বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংকগুলো আজ এমন নজিরবিহীন নাজুক পরিস্থিতিতে গিয়ে পৌঁছেছে। অতএব ব্যাংক খাতকে রক্ষা করা এবং সাধারণ আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থের নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে বড় বড় খেলাপিদের প্রতি যাবতীয় তোষণ নীতি অবিলম্বে বন্ধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কালবিলম্ভ না করে কঠোর ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, আমানতকারীদের তহবিলের সুরক্ষা দিতে ঋণের গুণগত মান ও শ্রেণিভেদে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাধারণ বা নিয়মিত ঋণে দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসানি ঋণে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।

 

যখন কোনো ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তখন নিয়ম অনুযায়ী সে লভ্যাংশ বণ্টন করতে পারে না। তাছাড়া প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখতে না পারলে ব্যাংকটি সরাসরি মূলধন ঘাটতির মুখে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক আর্থিক ভিত্তি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি দূর করার একমাত্র কার্যকর ও টেকসই পথ হলো খেলাপি ঋণ আদায় দ্রুত বাড়ানো এবং নতুন কোনো ঋণকে খেলাপিতে পরিণত হতে না দেওয়া।

 

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর