টানা বৃষ্টি ও ঢলের কারণে কয়েক দিন বিপর্যস্ত থাকার পর অবশেষে রোদ উঠায় স্বস্তি ফিরেছে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মাঝে। বৈশাখের চিরচেনা রূপে আবারও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে হাওরের খলা ও ধানক্ষেত। ধান শুকানো, মাড়াই এবং গোলায় তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক পরিবার।
এক সপ্তাহ আগে ধান মাড়াই করে খলায় স্তূপ করে রেখেছিলেন সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গোবিন্দপুর এলাকার কৃষক মোস্তফা মিয়া (৬০)। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে ধান আর শুকাতে পারেননি। ধান ভিজে থাকায় অনেকটায় অঙ্কুরও গজিয়ে গেছে। রোববার (৩ মে ২০২৬) সকালে রোদ ওঠার পর থেকে তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে আবারও ধান শুকানোর কাজে নেমে পড়েন।
মোস্তফা মিয়ার মতোই হাওরের অসংখ্য কৃষক পরিবার এখন দিনরাত এক করে ধান রক্ষার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। রোদ পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ফিরে এসেছে স্বস্তি, যদিও ক্ষতির শঙ্কাও রয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে দেখার হাওরের গোবিন্দপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খলার চারপাশে কৃষকদের ব্যস্ততা। কেউ ধান রোদে নাড়ছেন, কেউ বাতাসে উড়িয়ে শুকানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ ট্রাক্টর বা ঠেলাগাড়িতে ধান বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। নারীরা খুপরিতে বসে ধান বাছাই করছেন, শিশুরাও কাজে সহযোগিতা করছে।
হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বৈশাখ মাসে এমন দৃশ্য নিয়মিত হলেও এবারের পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে অনেক ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এরপর কয়েক দিন টানা বৃষ্টিতে কৃষকেরা মাঠে নামতে পারেননি।
হাওরের কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, তাঁর প্রায় ২৮ কিয়ার জমির মধ্যে ১৩ কিয়ার কেটে তুলতে পেরেছেন, ১০ কিয়ার পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি জমির ধান কাটা ও শুকানো নিয়ে তিনি এখন চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, “ধান খলায় এনে রেখেছিলাম, কিন্তু বৃষ্টিতে শুকাতে পারিনি। এখন রোদ পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলছে।”
তার ছেলে নয়ন মিয়া (১৮) বলেন, “অনেক ধান নষ্ট হয়ে গেছে, তবু রোদ ওঠায় আমরা বাঁচার আশা পাচ্ছি। এখন যা আছে সেটুকু হলেও বাঁচাতে পারলেই হয়।”
মোস্তফা মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া বেগম বলেন, যদি আরও কয়েক দিন রোদ থাকে তাহলে খলার সব ধান শুকিয়ে ঘরে তোলা সম্ভব হবে। তবে সময় খুবই সীমিত।
গোবিন্দপুর এলাকার আরেক কৃষক রোমান মিয়া বলেন, “জমির ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন খলার ধান যদি বাঁচাতে পারি, সেটাই বড় সান্ত্বনা।”
খলায় কাজের ফাঁকে খুপরি বানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে চলছে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ। হাওরের পাড়ে ছোট ছোট মেশিন দিয়ে ধান মাড়াই করা হচ্ছে, আর সেই ধান রোদে শুকানো হচ্ছে।
তবে স্থানীয় কৃষকদের কেউ কেউ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন। কৃষক কবির মিয়া অভিযোগ করেন, হাওরের পানিনিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁধ শুরুতে খোলা থাকলেও পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা ফসলের ক্ষতির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বাঁধটি কিছুদিন খোলা থাকলে জলাবদ্ধতা কমে যেত এবং ক্ষতি অনেক কম হতো।
সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও ঢলের কারণে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে জলাবদ্ধতায় আরও প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমি রয়েছে। শনিবার পর্যন্ত ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাওরে রোদ ওঠা কৃষকদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। যদি আরও কয়েক দিন অনুকূল আবহাওয়া থাকে তাহলে অবশিষ্ট ধান দ্রুত গোলায় তোলা সম্ভব হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “রোদ পাওয়া কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি আবহাওয়া স্থিতিশীল থাকে, তাহলে ক্ষতির কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”
তিনি আরও জানান, এখনো পুরো ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব করা হয়নি, যা নির্ধারণে আরও কিছু সময় লাগবে।
হাওরের কৃষকরা এখন একটাই প্রত্যাশা নিয়ে আছেন—আবহাওয়া যেন আর প্রতিকূল না হয় এবং শেষ মুহূর্তের ফসল ঘরে তুলতে পারেন।