ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের উত্তরখানে যুবলীগের গোপন বৈঠক, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৮ বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে ছেলের জন্মদিনে একফ্রেমে রাজ-শুভশ্রী বিয়ের আনন্দ রূপ নিল বিষাদে, সড়কে ঝরল ৪ প্রাণ ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা, ৯ জনের প্রাণহানি সুইডেনে সংসদ নির্বাচন: কট্টর ডানপন্থীদের সরকারে আসার জোর সম্ভাবনা

গত বছর হটস্পট, এবারও ডেঙ্গু আতঙ্কে বরগুনাবাসী


  • আপলোড সময় : রবিবার ১০ মে, ২০২৬ সময় : ৪:২১ পিএম

বরগুনা প্রতিনিধি 

গত বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপে দেশের অন্যতম হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল বরগুনা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবেই মারা যান ১৫ জন। তবে স্থানীয়দের দাবি, জেলার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আরও অন্তত ৪৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় প্রায় ১০ হাজারে। নতুন করে আবারও ডেঙ্গুর মৌসুম ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত বরগুনায় মশক নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

স্থানীয় বাসিন্দা, চিকিৎসক ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, গত বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়ার কথা থাকলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো মশক নিধন কার্যক্রম, ড্রেন পরিষ্কার কিংবা জলাবদ্ধতা নিরসনে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার ২ নম্বর গৌরীচন্না ইউনিয়নের দক্ষিণ মনসাতলী এলাকা। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। অসংখ্য ডোবা-নালা ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে মশার বংশবিস্তার দ্রুত ঘটে। স্থানীয়রা জানান, এলাকাটিতে মাত্র একটি ড্রেন রয়েছে এবং সেটিও নিজেদের উদ্যোগে পরিষ্কার করতে হয়।

দক্ষিণ মনসাতলীর বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বলেন, জনসংখ্যা বাড়লেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বাড়েনি। নতুন ড্রেন নির্মাণ ও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে মশার উপদ্রব বাড়ছে এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ছে।

একই এলাকার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, গত বছর প্রায় প্রতিটি ঘরেই ডেঙ্গু রোগী ছিল। অথচ এ বছর এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম শুরু না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা তার।

শুধু দক্ষিণ মনসাতলী নয়, বরগুনা পৌর শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো, ড্রেন পরিষ্কার বা সচেতনতামূলক অভিযানও খুব একটা চোখে পড়ছে না।

পৌর শহরের বাসিন্দা মোর্শেদ সুজন বলেন, গত বছর ডেঙ্গুতে ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এবার পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে তেমন নজর নেই। এতে আবারও বরগুনা ডেঙ্গুর হটস্পটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম নাবিল নামে আরেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে নাগরিক সেবার মান কমেছে। শুধুমাত্র প্রশাসনিক এলাকা ও কর্মকর্তাদের বাসভবনের আশপাশে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হলেও সাধারণ মানুষের এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে বাইরে অবস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, গত বছর মার্চের পর থেকেই বরগুনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ২৫০ শয্যার বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকতেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ বরগুনাকে ডেঙ্গুর হটস্পট ঘোষণা করে। জরুরি ভিত্তিতে ১০ জন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়।

ডেঙ্গুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গত বছরের ১৫ জুন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীনের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ছয় সদস্যের তদন্ত দল গঠন করা হয়। ১৭ জুন সরেজমিন পরিদর্শনের পর তদন্ত দল জানায়, স্থানীয়দের অসচেতনতা এবং খোলা পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে থাকাই ডেঙ্গু বিস্তারের প্রধান কারণ।

বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ৭ হাজার ৪৩৫, পাথরঘাটায় ১ হাজার ৬৫, তালতলীতে ৩৩৩, আমতলীতে ১৯৪, বামনায় ৪৭৩ এবং বেতাগীতে ২৪৯ জন চিকিৎসা নেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ১৫ জনের। এর মধ্যে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ১২ জন, পাথরঘাটায় ২ জন এবং আমতলীতে ১ জন মারা যান। এছাড়া জেলার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।

চলতি বছরও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৯১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ২৫, পাথরঘাটায় ৪৬, বামনায় ১৪, বেতাগীতে ২ এবং আমতলীতে ৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি মনির হোসেন কামাল বলেন, বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়তে পারে। গত কয়েকদিনেই নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তাই এখনই সমন্বিতভাবে কাজ শুরু না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

বরগুনার পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন বলেন, গত বছরের ভয়াবহ পরিস্থিতির স্মৃতি এখনো মানুষ ভুলতে পারেনি। এ বছর আগাম ব্যবস্থা না নিলে আবারও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাই এখনই ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সপ্তাহে অন্তত তিন দিন মশার ওষুধ ছিটানো জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় গত বছর সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছিল, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তবে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরগুনা জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পৌরসভার প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য ফগার মেশিন কেনা হয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি শনিবার খাল বা পুকুর পরিষ্কারের কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এদিকে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানিয়েছেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হাসপাতালগুলোকে আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত করা হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং জনবল সংকট থাকলেও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে।

আকাশজমিন / আরআর  


এ সম্পর্কিত আরো খবর