পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে এক অবিস্মরণীয় ও মহাকাব্যিক ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। মিরপুর টেস্টে দাপুটে জয়ের পর সিলেটেও নিজেদের অবিশ্বাস্য ও আধিপত্যশীল পারফরম্যান্সের ধারা বজায় রাখল স্বাগতিকরা। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচে শক্তিশালী পাকিস্তানকে ৭৮ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ধবলধোলাই বা হোয়াইটওয়াশ করল টাইগাররা। ঘরের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার পরম গৌরবান্বিত ও অনন্য রেকর্ড নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ দল।
সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিন শেষেই জয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে ছিল বাংলাদেশ। কোনো অলৌকিক কিছু না ঘটলে এই টেস্টে বাংলাদেশের জয় আটকানো পাকিস্তানের জন্য অসম্ভব ছিল। তবে পঞ্চম দিন বুধবার (২০ মে) সকালে প্রথম সেশনে মাঠে নেমে এক লড়াকু প্রতিরোধ গড়ে উল্টো বাংলাদেশ শিবিরেই ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন সফরকারী ব্যাটাররা। দলের অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও ইনফর্ম ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ানের সঙ্গে লেজের সারির ব্যাটার সাজিদ খান বেশ সাবলীল ব্যাটিং করছিলেন। ঠিক তেমন এক চরম উত্তেজনা ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আরও একবার বাংলাদেশের প্রধান ত্রাতা হয়ে বোলিং আক্রমণে আবির্ভূত হলেন নির্ভরযোগ্য স্পিনার তাইজুল ইসলাম।
টেলএন্ডার সাজিদ খানকে আউট করে প্রথমে টাইগার শিবিরে স্বস্তি ফেরান তাইজুল। এরপর সেঞ্চুরির একেবারে দ্বারপ্রান্তে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ানও আর বেশি সময় ক্রিজে টিকে থাকতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যেই যেন পুরো ম্যাচের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। শেষ দিকে খুররাম শেহজাদকে দ্রুত আউট করে পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটাও ঠুকে দেন সেই তাইজুল ইসলাম।
ম্যাচের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের ছুঁড়ে দেওয়া ৪৩৭ রানের পাহাড়সম ও প্রায় অসম্ভব লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে পাকিস্তান ক্রিকেট দল ৭ উইকেটে ৩১৬ রান সংগ্রহ করেছিল। শেষ দিনে এসে বিশ্বরেকর্ড গড়া ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩টি উইকেট, আর পাকিস্তানের দরকার ছিল ১২১ রান।
পঞ্চম দিনের শুরুতে ব্যাট করতে নামেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার মোহাম্মিদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। দিনের শুরুতেই এই বিপজ্জনক জুটি ভেঙে দেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের সামনে। গতি তারকা নাহিদ রানার করা একটি চমৎকার বলে স্লিপে সহজ ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন রিজওয়ান। কিন্তু প্রথম স্লিপে থাকা অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ হাতের সেই ক্যাচটি অবিশ্বাস্যভাবে মিস করেন। এই অবিশ্বাস্য জীবনদান পাওয়ার পর বাংলাদেশকে রীতিমতো ভোগাতে থাকেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। এই দুই ব্যাটারের মারকুটে ও অনবদ্য ব্যাটিংয়ের কল্যাণে একপর্যায়ে ম্যাচ জেতার অলীক স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল পাকিস্তানিরা।
কিন্তু সফরকারীদের সেই আশার পালে হাওয়া লাগতে দেননি বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। সাজিদ খানকে ব্যক্তিগত ২৮ রানে আউট করার মাধ্যমে তিনি নিজের অনবদ্য ফাইফার অর্থাৎ ৫টি উইকেট শিকারের গৌরব পূর্ণ করেন। আউট হওয়ার আগে ৩৬ বল খেলেছিলেন সাজিদ। অন্যদিকে সেঞ্চুরির পথেই হাঁটছিলেন পাকিস্তানি উইকেটকিপার ব্যাটার রিজওয়ান। কিন্তু তাকে শতক পূর্ণ করতে দেননি পেসার শরিফুল ইসলাম। মিরাজের হাতে ক্যাচ তুলে দেওয়ার আগে ১৬৬ বলে ১০টি চারের সাহায্যে ৯৪ রানের এক চোখধাঁধানো ইনিংস খেলেন রিজওয়ান।
পাকিস্তানের পক্ষে খুররাম শেহজাদ রানের খাতা খোলার আগেই তাইজুলের বলে আউট হন এবং শূন্য রানে অপরাজিত থাকেন মোহাম্মদ আব্বাস। বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে একাই ধস নামান তাইজুল ইসলাম। তিনি ৩৪.২ ওভার বল করে ১২০ রান খরচায় একাই শিকার করেন সর্বোচ্চ ৬টি উইকেট। এছাড়া দুটি উইকেট নেন নাহিদ রানা, আর একটি করে উইকেটের দেখা পেয়েছেন শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
এর আগে ম্যাচের শুরুতে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে লিটন দাসের অনবদ্য সেঞ্চুরির ওপর ভর করে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে ২৩২ রানেই থামে পাকিস্তান। ফলে ৪৬ রানের মূল্যবান লিড পায় স্বাগতিকরা। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ দলের ব্যাটাররা দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ৩৯০ রান সংগ্রহ করলে পাকিস্তানের সামনে জয়ের টার্গেট দাঁড়ায় ৪৩৭ রান। কিন্তু শেষ ইনিংসে বুক চিতিয়ে লড়াই করেও পাকিস্তান অলআউট হয়েছে ৩৫৮ রানেই। এই সিরিজ জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করল।