সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 62
পবিত্র ঈদুল আজহা দরজায় কড়া নাড়ছে। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কামার পল্লীর কারিগররা এখন ইতিহাসের অন্যতম ব্যস্ত সময় পার করছেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিন-রাত সমান তালে চলছে তাদের কর্মযজ্ঞ। কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস কাটাকাটির জন্য অপরিহার্য চাপাতি, ধারালো চাকু ও বটিসহ লোহার নানা সরঞ্জাম তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন স্থানীয় কামাররা। বছরের এই বিশেষ সময়টায় দেশজুড়ে কামারশালার জিনিসপত্রের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় কামাররা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো উপার্জন করে থাকেন।
সরেজমিনে তাড়াশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়লার চুলার দগদগে লাল আগুনের শিখা আর গনগনে গরম লোহা পিটানোর অবিরাম ‘টুংটাং’ শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো তাড়াশ উপজেলার প্রতিটি কামারশালা। এই টুংটাং শব্দের তীব্রতা এতটাই যে, কামার পল্লীর কারিগররা এখন রাতেও ঘুমানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। কোরবানির ঈদ এলে প্রতি বছরই নতুন আশায় বুক বাঁধেন এই প্রান্তিক কারিগররা, কারণ এই একটি মৌসুমেই তাদের সবচেয়ে বড় ধরণের বাড়তি আয় হয়ে থাকে। পশুর মাংস কাটাকুটির জন্য লোহার তৈরি নতুন সরঞ্জামের যেমন চাহিদা বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পুরনো সরঞ্জাম মেরামতের কাজও। ফলে কামারদের এখন দম ফেলার যেন ফুরসত নেই।
পৌর এলাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, বর্তমান বাজারে মানভেদে প্রতিটি নতুন চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায়, মাংস কাটার বটি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায় এবং আকার অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার ছুরি বা চাকু ২০০ থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। নতুন লোহা কেনার পাশাপাশি প্রতিদিন শত শত মানুষ তাদের পুরনো চাকু ও বটিতে শান দেওয়ার (ধারালো করার) জন্য কামারদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। তাড়াশ উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় বর্তমানে ছোট-বড় অনেকগুলো ঐতিহ্যবাহী কামারশালা রয়েছে, যেখানে সব মিলিয়ে কয়েকশ পরিবার এই পেশার সাথে যুক্ত।
কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততা সম্পর্কে তাড়াশ পৌর সদরের মানিক কামার অত্যন্ত আক্ষেপ ও আনন্দের মিশ্র অনুভূতি প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "সারা বছর আমাদের খুব একটা কাজ-কর্ম থাকে না। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা হয়। আমরা মূলত সারা বছর কোরবানির ঈদের এই সুবর্ণ সময়টার জন্যই চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকি। কারণ এই সময়ে আমাদের যে বাড়তি কিছু আয় হয়, তা দিয়ে বছরের বাকি দিনগুলোতে সংসারের অনেক ধার-দেনা ও জরুরি খরচ মেটাতে পারি।" তিনি আরও বলেন, "অধিকাংশ গ্রাহকই একদম শেষ মুহূর্তে এসে কাজের জন্য চাপ দেন। অথচ তারা যদি ঈদের কিছুদিন আগে থেকে আসতেন, তাহলে আমাদের কাজ করতে অনেক সুবিধে হতো। বর্তমানে দিনে-রাতে সমানভাবে বিরতিহীন কাজ করছি, ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত পাচ্ছি না! তারপরও অভাবের সংসারের কথা চিন্তা করে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত এভাবেই একটানা কাজ করে যাব।"
স্থানীয় সচেতন ক্রেতারা জানিয়েছেন, কয়লা ও লোহার দাম বেড়ে যাওয়ায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার নতুন সরঞ্জামের দাম কিছুটা বেশি। তবে ঈদের প্রয়োজনেই তারা হাসিমুখে এসব জিনিস কিনে নিচ্ছেন। পবিত্র ঈদুল আজহার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কামার পল্লীর এই ব্যস্ততা ও ঐতিহ্যবাহী ‘টুংটাং’ শব্দের ছন্দময় আবহ বজায় থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আকাশজমিন / আরআর