ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

তাড়াশে থামছেই না অবৈধ পুকুর খনন, হুমকিতে শস্যভাণ্ডার


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৫ মে, ২০২৬ সময় : ১০:৪৫ পিএম

রেজাউল ক‌রিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় অবৈধ পুকুর খনন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা ও কারাদণ্ডের পরও উর্বর কৃষিজমি কেটে পুকুর তৈরির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। এতে দিন দিন কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য জমি, বাড়ছে জলাবদ্ধতা এবং হুমকির মুখে পড়ছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত তাড়াশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা।

স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসন জানায়, অবৈধ পুকুর খনন ঠেকাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ১০টি মামলা দায়ের এবং ৭ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও বাস্তবে বন্ধ হয়নি কৃষিজমি ধ্বংসের এই কার্যক্রম।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে গভীর রাতে এক্সকাভেটর বা ভেকু মেশিন দিয়ে জমি কেটে পুকুর খনন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কাজ পরিচালিত হওয়ায় সাধারণ কৃষকরা প্রতিবাদ করেও কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দেড় দশকে তাড়াশ উপজেলায় ১৫ হাজার বিঘারও বেশি আবাদযোগ্য উর্বর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। এসব জমির বড় অংশ এখন মাছ চাষের পুকুরে পরিণত হয়েছে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার ২০০টি। চলতি বছরে সেই সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে তাড়াশ দীর্ঘদিন ধরেই “শস্যভাণ্ডার” হিসেবে পরিচিত। একসময় এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধান, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্যের ব্যাপক উৎপাদন হতো। কিন্তু অপরিকল্পিত ও অবৈধ পুকুর খননের কারণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, যত্রতত্র পুকুর খননের ফলে কৃষিজমির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এতে বোরো মৌসুমের পাকা ধান পানিতে নুয়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।

তাড়াশ পৌর এলাকার সোনাপাতিল গ্রামের কৃষক নয়ন ও রাজ্জাক বলেন, “কয়েক দিনের সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই মাঠের ধান পানিতে ডুবে গেছে। পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। এখন বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক এনে ধান কাটতে হচ্ছে। এতে আমরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি।”

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অবৈধ পুকুর খননের কারণে এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, গ্রামীণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, “অবৈধভাবে পুকুর খনন বন্ধ করা না গেলে এই অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। কৃষিজমি স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধ হয়ে গেলে একসময় ফসল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান বলেন, “অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা গভীর রাতে পুকুর খননের চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেই হবে না; কৃষিজমি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি, কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে তাড়াশের ঐতিহ্যবাহী শস্যভাণ্ডার।



এ সম্পর্কিত আরো খবর