কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্য, ত্যাগ ও তাকওয়ার এক মহান প্রতীক। ইসলামের ইতিহাসে কোরবানির সূচনা মানবজাতির একেবারে প্রাচীন অধ্যায় থেকেই। পবিত্র কুরআন আমাদের সামনে তুলে ধরেছে নবী আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা, যেখানে প্রথমবারের মতো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উৎসর্গের শিক্ষা মানবজাতি লাভ করে।
এরপর ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় ت্যাগের মাধ্যমে কোরবানির প্রকৃত চেতনা পৃথিবীব্যাপী চিরস্মরণীয় হয়ে ওঠে। জায়েদ বিন আরকাম (রা.) বর্ণনা করে বলেন:
একবার সাহাবিরা মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), এই কোরবানি কী? তিনি বলেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, এতে কি আমাদের সওয়াব আছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে একটি সওয়াব হবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), ভেড়ার পশমের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য? তিনি বললেন, ভেড়ার প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে একটি সওয়াব লেখা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর : ২৬০)
হাবিল ও কাবিলের প্রথম কোরবানি
সর্বপ্রথম আদম (আ.)-এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল কোরবানি শুরু করেছেন। পবিত্র কুরআনে একটি বিরোধ মীমাংসার জন্য তাদের করা কোরবানির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘আدم (আ.)-এর দুই পুত্রের ঘটনা তাদের যথাযথভাবে শোনান, যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল করা হয় এবং অন্যজনের কবুল হয়নি।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২৭)
দুই ভাইয়ের মধ্যে হাবিলের কোরবানি কবুল হয়। যার কোরবানি কবুল হয়নি সে অন্যজনকে হত্যার হুমকি দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি আমাকে হত্যার জন্য হাত বাড়ালেও আমি তোমাকে হত্যার জন্য হাত বাড়াব না, আমি উভয় জগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করো এবং জাহান্নামের অধিবাসী হও, এটা অত্যাচারীদের কর্মফল। অতঃপর তার ভাইকে হত্যা করতে উত্তেজিত হয়, অতঃপর সে তাকে হত্যা করে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২৮-৩০)
ইবরাহিম (আ.)-এর প্রিয় বস্তু উৎসর্গ ও কুরআনের বর্ণনা
মূলত আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসরণ করে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে কোরবানির নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়। মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নযোগে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর জন্য কোরবানির নির্দেশ দেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তিনি সন্তানকে কোরবানি করতে পুরোপুরি প্রস্তুতি নেন। এমন সময় মহান আল্লাহ ইসমাঈল (আ.)-এর বদলে পশু কোরবানির নির্দেশ দেন।
আল্লাহর জন্য পিতা ও পুত্রের উৎসর্গের পুরো ঘটনার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এভাবে এসেছে:
‘তিনি [ইবরাহিম (আ.)] বলেন, হে আমার রব, আমাকে একজন সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে একজন বুদ্ধিমান পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে [ইসমাঈল (আ.)] যখন কাজের বয়সে উপনীত হয়, তখন ইবরাহিম বলল, হে আমার পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখি যে তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার মত কী, বলো। সে বলল, হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন, আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।
যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং তিনি [ইবরাহিম (আ.)] পুত্রকে জবাইয়ের জন্য কাত করেন। তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহিম, আপনি স্বপ্নের আদেশ পালন করেছেন। আমি এইভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই তা ছিল সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে একটি (কোরবানির) জন্তুর মাধ্যমে মুক্ত করি। আমি তা পরবর্তীদের জন্য বিধান হিসেবে রেখেছি।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০০-১০৮)
কোরবানির মূল শিক্ষা
মুমিনরাও যেন নিজেদের প্রাণ ও প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর জন্য সঁপে দিতে সদা প্রস্তুত থাকে, এটাই কোরবানির প্রধান শিক্ষা। তাই কোরবানি হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘আল্লাহর কাছে (কোরবানির পশুর) মাংস, রক্ত পৌঁছে না, বরং আল্লাহর কাছে তোমাদের তাকওয়া (তথা একনিষ্ঠভাবে সম্পন্ন আমল) পৌঁছে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
অতএব, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করাই মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। হাবিলের একনিষ্ঠতা এবং ইবরাহিম (আ.)-এর অকল্পনীয় আত্মত্যাগ আজও মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ কোরবানি দেওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা ও গুনাহকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দেওয়াই এর আসল শিক্ষা। যখন মানুষের অন্তরে তাকওয়া ও আত্মসমর্পণের এই চেতনা জাগ্রত হবে, তখনই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য ও তাৎপর্য বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে। ইনশাআল্লাহ।