নাটোরের গুরুদাসপুরে কবরস্থানের পাশের এক বিশাল বটগাছের মগডালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির দিনভর লাফালাফি ও অবস্থানের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় লোকজনের কয়েক ঘণ্টার চেষ্টা এবং পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান সবাইকে চরম ভাবিয়ে তোলে। অবশেষে শত শত মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে দিন শেষে ওই ব্যক্তিকে বিশেষ কৌশলে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। বুধবার দিনভর এই অদ্ভুত ও রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের মকিমপুর কবরস্থানের পাশের একটি পুরোনো বটগাছে।
মকিমপুর গ্রামের স্থানীয় অন্তত সাতজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই গ্রামের দানেশ খাঁর ছেলে হাসান খাঁ (৪৭) সম্প্রতি মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। মাদক গ্রহণের পর থেকেই গত কয়েক দিন ধরে তিনি বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ আজ সকাল আনুমানিক আটটার দিকে তিনি গ্রামের কবরস্থানের পাশের প্রায় ১০০ ফুট লম্বা একটি বটগাছের মগডালে উঠে পড়েন। গাছের চূড়ায় উঠেই তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং বন্য বানরের মতো এক ডাল থেকে অন্য ডালে ঝুল দিয়ে বিপজ্জনকভাবে লাফালাফি করতে থাকেন। প্রথমে তাঁর পরিবারের সদস্যরা এবং পরে প্রতিবেশীরা তাঁকে গাছ থেকে নিচে নামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে জানাজানি হলে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকেও শত শত উৎসুক মানুষ ওই বটগাছের নিচে এসে ভিড় জমান। মগডালে ওই ব্যক্তির বিপজ্জনক লাফালাফি দেখে উপস্থিত সবার মধ্যে হাসান খাঁর প্রাণহানির আশঙ্কা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দেয়।
খবর পেয়ে গুরুদাসপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উদ্ধারকারী কর্মীরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরা গাছের নিচে বড় সুরক্ষা জাল বিছিয়ে এবং নানামুখী প্রলোভনে হাসান খাঁকে নিচে নামানোর চেষ্টা করলেও শুরুতে ব্যর্থ হন। এভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলেও তাঁকে নামানো সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা একটি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। তাঁরা হাসানের প্রিয় বিস্কুট, কলাসহ নানা ধরনের পছন্দের খাবার বটগাছের অপেক্ষাকৃত শক্ত ডালপালায় রেখে দেন এবং হ্যান্ডমাইক বা হাতমাইকের মাধ্যমে তাঁকে সেসব খাবার খাওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে থাকেন। কিন্তু হাসান সহজে নিচে নামতে চাচ্ছিলেন না এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও মগডালটি দুর্বল হওয়ায় তাঁর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছিলেন না।
পরবর্তীতে সন্ধ্যার দিকে হাসান খাঁ প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লে খাবারের লোভে ধীরে ধীরে নিচের ডালগুলোর দিকে নামতে শুরু করেন। তিনি নিচে নামামাত্রই ওত পেতে থাকা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁকে ধরে ফেলেন। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় পুলিশের সামনে তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গুরুদাসপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার আতাউর রহমান বলেন, “আমরা সকাল ১১টা ১০ মিনিটে খবর পাওয়ার পরপরই হাসান খাঁকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করি। দীর্ঘ সময় ধরে নানামুখী চেষ্টার পর সন্ধ্যার আগ দিয়ে তাঁকে নানা কিছু খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে গাছ থেকে নিরাপদে নামিয়ে আনতে সক্ষম হই।” প্রতিবেশী মজিদ প্রামাণিক জানান, হাসান খাঁ মাদকাসক্ত হওয়ার পর থেকে মাঝেমধ্যে হিন্দুদের শ্মশানেও শুয়ে থাকতেন। আজ হঠাৎ কবরস্থানের গাছের মগডালে উঠে যান। তাঁর বাবা দানেশ খাঁ জানান, ছেলেকে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দেখে পুরো পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছিল, তবে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাওয়ায় তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।