দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে চলমান চরম অস্থিরতা, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তীব্র ক্ষোভ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভ্যন্তরীণ চরম অসন্তোষের মুখে অবশেষে একযোগে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)–এর চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ চারজন কমিশনার। বৃহস্পতিবার তাঁরা সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে স্ব-শরীরে গিয়ে তাঁদের আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগ করা অন্য চারজন কমিশনার হলেন—মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো. সাইফুদ্দিন। দেশের শেয়ারবাজারের শীর্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই পুরো পরিচালনা পর্ষদের একযোগে পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আর্থিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সদ্য পদত্যাগ করা বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট চার বছরের মেয়াদে এই পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই নানা বিতর্কের মুখে তাঁকে পদ ছাড়তে হলো। অন্য কমিশনারদের মধ্যে মু. মহসীন চৌধুরী ২০২৪ সালের ২ জুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে একই বছরের ২৮ আগস্ট মো. আলী আকবর এবং ৩ সেপ্টেম্বর ফারজানা লালারুখ কমিশনার হিসেবে বিএসইসিতে যোগ দেন। আর পর্ষদের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মো. সাইফুদ্দিন।
এই গণপদত্যাগের পটভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত দুই দিন আগে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা একটি বড় ঘোষণার মাধ্যমে। গত ২ জুন দেশের পুঁজিবাজারের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর ঘোষণা দেন। সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর ওই প্রকাশ্য ঘোষণার পর থেকেই বিএসইসিতে আমূল পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায় এবং সর্বত্র জোর আলোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সেই ঘোষণার জের ধরেই আজ চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনার একযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।
উল্লেখ্য, চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের দাবিতে গত কয়েক মাস ধরেই বিএসইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কমিশনের ভেতরেই ধারাবাহিক ও জোরালো আন্দোলন পরিচালনা করে আসছিলেন। তাঁরা নিয়মিত কর্মবিরতি, বিক্ষোভ সমাবেশসহ বিভিন্ন ধরনের কঠোর কর্মসূচি পালন করেন, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রমকে স্থবির করে দিয়েছিল। কর্মকর্তাদের এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের পাশাপাশি বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছিলেন। পুঁজি হারানো সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিএসইসি পুনর্গঠনের জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে আজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিনিয়োগকারীদের সেই যৌথ দাবির মুখে পুরো কমিশন একযোগে পদত্যাগ করল, যা দেশের পুঁজিবাজারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে ধারণা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।