উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি : / : 46
রাজশাহীর আম মানেই স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এক অনুভূতি। জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের একটি বিশেষ আমবাগানে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে যায় রঙের বাহার দেখে। কোনো গাছে ঝুলছে টকটকে লালচে আভাযুক্ত আম, কোথাও গাঢ় বেগুনি রঙের, আবার কোথাও মনকাড়া হলুদ কিংবা চিরচেনা সবুজ আম। এক বাগানেই দেশি-বিদেশি নানা জাতের আমের এমন অবিশ্বাস্য সমাহার দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের কৌতূহল ও আনন্দ বাড়িয়ে তুলেছে। কেউ ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য ভিডিও করছেন, আবার অনেকে কৌতূহল নিয়ে নতুন জাতের আমের চারা সংগ্রহের খোঁজখবর করছেন। আম চাষের এই ব্যতিক্রমী বাগানটির স্বপ্নদ্রষ্টা ও মালিক হলেন স্থানীয় উদ্যোক্তা হানিফ আলী মণ্ডল। প্রচলিত বা সনাতন আম চাষের গণ্ডি পেরিয়ে গত কয়েক বছর ধরে তিনি দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন দুর্লভ জাতের আম নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। বর্তমানে তাঁর এই সুবিন্যস্ত বাগানে ৩০ জাতের আম রয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশই হলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিদেশি জাতের আম।
বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে আমের ভরা মৌসুম চলছে এবং বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর আম। একই সঙ্গে বাজারে আসতে ও পাকতে শুরু করেছে সুস্বাদু হাঁড়িভাঙ্গা আমও। তবে হানিফ আলী মণ্ডলের মূল আগ্রহ ও গবেষণা মূলত দেরিতে পাকে বা লেট ভ্যারাইটির এমন জাতের আম নিয়ে। হানিফ মণ্ডল জানান, মে ও জুনের শুরুতে বাজারে আমের সরবরাহ অনেক বেশি থাকায় দাম তুলনামূলকভাবে বেশ কম থাকে। কিন্তু জুলাই কিংবা আগস্ট মাসের দিকে যখন সাধারণ আমের সরবরাহ বাজারে কমে যায়, তখন আমের দাম এক লাফে অনেক বেড়ে যায়। তাই তিনি এমন কিছু বিশেষ জাতের আম নিয়ে কাজ করছেন, যেগুলো মৌসুমের একেবারে শেষ দিকে বাজারে আসে। এতে সাধারণ চাষিরা অন্য সময়ের চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি লাভ করতে পারেন। একই জমিতে এবং সমপরিমাণ পরিচর্যায় যদি দেরিতে ফলন সংগ্রহ করে বেশি দাম পাওয়া যায়, তবে তা কৃষকের ভাগ্য বদলে দেবে। সেই বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তাঁরা এখন বাস্তব ক্ষেত্রে যাচাই করছেন।
তাঁর এই সমৃদ্ধ বাগানে আম্রপালি, বারি আম–৪, গৌড়মতি, বারি আম–১১, হাড়িভাঙ্গা, বারি আম–১৬, কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, খিরসাপাত, ফজলি, আশিনা, লক্ষণভোগ, কিউজাই, কিং অব চাকাপাত, চিয়াং মাই, রেড পামার, থ্রি টেস্ট, কেইট, টমি অ্যাটকিন্স, সূর্য ডিম বা মিয়াজাকি, অম্বিকা, অস্টিন ম্যাঙ্গো, অরুনিকা, কাঁচামিঠা, ব্ল্যাক স্টোন, অল টাইম রেড, ল্যাংড়া, দুধসর, নাম ডক মাই ও গোপালভোগ জাতের আম রয়েছে। শুধু আমই নয়, হানিফ মণ্ডলের বাগানে সাথি ফসল হিসেবে আছে সুস্বাদু মাল্টা, আনার, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর ফলের গাছ। বিশেষ করে থোকা থোকা হলুদ রঙের মাল্টা দেখতে অনেকেই এই বাগানে ভিড় জমান, যার ফলে বাগানটি ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে একটি চমৎকার দর্শনীয় স্থানে রূপ নিয়েছে। গোদাগাড়ী উপজেলা থেকে এই বৈচিত্র্যময় বাগান দেখতে এসেছিলেন সাব্বির রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরও ঐতিহ্যবাহী আমবাগান আছে। তবে এখানে বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য বিদেশি জাতের আম স্বচক্ষে দেখতে এসেছি। বিশেষ করে গৌরমতি, মিয়াজাকি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো জাতগুলো আমার খুব ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে এখান থেকে কয়েকটি জাতের চারা সংগ্রহ করার পরিকল্পনা আছে।’
আরেক দর্শনার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহবুব আলম বলেন, ‘বাগানটি ঘুরে দেখে আমার খুবই ভালো লাগছে। এখানে শুধু আম নয়, বিভিন্ন ধরনের ফল নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কাজ হচ্ছে। আমরা নিজেরাও ভবিষ্যতে কৃষিতে নতুন কিছু করার চিন্তা করছি, সেই আগ্রহ থেকেই মূলত দেখতে এসেছি।’ হানিফ মণ্ডল জানান, তাঁর বাগানে আসা অনেক দর্শনার্থী জীবনে প্রথমবারের মতো লাল বা বেগুনি রঙের আম সরাসরি গাছে ঝুলতে দেখছেন। এই কৌতূহল থেকেই অনেক পরিবার উইকএন্ডে বাগান দেখতে আসে। দর্শনার্থীদের কেউ ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন, আবার অনেকেই বাগান থেকে পেড়ে ফলের তাজা স্বাদ নিয়ে দেখেন।
একই সাথে নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের বিষয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন হানিফ আলী মণ্ডল। বাগানের অনেক আম বিশেষ কাগজের ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, যাকে কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতি বলা হয়। বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন দক্ষ শ্রমিক সকাল থেকেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি আমে ব্যাগিংয়ের কাজ করছেন। প্রতিটি ফল আলাদা ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় ক্ষতিকারক মাছির আক্রমণ থেকে ফল রক্ষা পায় এবং কীটনাশকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। হানিফ মণ্ডল বলেন, ব্যাগিং করলে ফল অনেক বেশি নিরাপদ ও দাগহীন থাকে এবং দীর্ঘ সময় কোনো রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর প্রয়োজন হয় না। এতে ভোক্তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও অর্গানিক আম পান। তাঁর উৎপাদিত আমের বড় একটি অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইনের মাধ্যমে ই-কমার্সের সাহায্যে সরাসরি হোম ডেলিভারি দেওয়া হয়, তাই তিনি স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক কম আম বিক্রি করেন। এই বাগানটি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। হানিফ মণ্ডলের এই অ্যাগ্রো ফার্মে নিয়মিত সাত থেকে আটজন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করেন এবং মৌসুমভেদে শ্রমিকের সংখ্যা আরও বাড়ে। নতুন জাতের আমের ফলন, চমৎকার স্বাদ ও ব্যাপক বাজার সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে এই প্রকল্প আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে হানিফ মণ্ডলের, যা রাজশাহীর আম চাষে যুক্ত করবে নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত।