আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলায় খসড়া অভিযোগপত্রে নাম থাকা বাংলাদেশি ১০ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরবর্তী কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত শেষে অবশেষে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে যাচ্ছে দেশের এই শীর্ষ অপরাধ তদন্ত সংস্থাটি। সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতকৃত এই অভিযোগপত্রে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ৯ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সরাসরি গাফিলতি ও সংশ্লিষ্টতার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আদালতে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অভিযোগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার পরপরই তালিকায় নাম আসা দেশীয় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে সিআইডি।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার এই চূড়ান্ত অভিযোগপত্রের সার্বিক অগ্রগতি ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে সিআইডির প্রধান এবং অতিরিক্ত আইজিপি আলী আকবর খান গণমাধ্যমকে বলেন, “এই হাই-প্রোফাইল মামলার তদন্ত আসলে অন্যান্য সাধারণ মামলার তদন্তের মতোই নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলমান রয়েছে। এটি চূড়ান্ত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি সময় লেগেছে—এটি সম্পূর্ণ সত্য। তবে এর পেছনে অনেকগুলো অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগত (টেকনিক্যাল) কারণ রয়েছে। যেহেতু এটি কোনো সাধারণ বা অর্ডিনারি মামলা নয়, এর সাথে বহু আন্তর্জাতিক ও টেকনিক্যাল আসপেক্ট জড়িত ছিল। তদন্তের স্বার্থে আমাদের অনেক দেশি এবং বিদেশি সংস্থার সরাসরি সহায়তা নিতে হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে এর অফিশিয়াল অনুমোদন বা অ্যাপ্রুভাল পেতে আমাদের বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।”
তদন্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ টেনে সিআইডি প্রধান আরও যোগ করেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI) থেকে যখন কোনো একটি স্পর্শকাতর রিপোর্ট পাওয়া যায়, তখন তাদেরও একদম সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন হওয়ার পরই তারা তা হস্তান্তর করে। স্বভাবতই এই পুরো আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ (টাইম কনজিউমিং)। আর এই সব যৌক্তিক কারণেই মূলত সময় লেগেছে, তবে আমরা এখন সবকিছু সম্পূর্ণ গুছিয়ে এনেছি। আমরা ইতিমধ্যে এই চূড়ান্ত চার্জশিটের আইনি খুঁটিনাটি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সাথেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছি, যাতে উনাদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো আইনি মতামত বা পরামর্শ প্রয়োজন হলে তা যুক্ত করা যায়। এটি আমাদের রুটিন ওয়ার্কেরই অংশ ছিল। এই মেগা মামলার তদন্ত এখন পুরোপুরি ক্লোজ বা শেষ করে আনা হয়েছে এবং আমরা আশা করছি যে আদালতে মূল অভিযোগপত্র জমা দিতে এখন আর খুব বেশি দেরি হবে না।”
অভিযোগপত্রে নাম থাকা দেশীয় আসামিদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিআইডি প্রধান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, “হ্যাঁ, আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবশ্যই আমরা আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে দেখবো। এটি ইতিমধ্যেই আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় (কন্সিডারেশন) রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমরা এখনই কোনো আগাম চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসিনি। ইনশাল্লাহ আদালতে অভিযোগপত্রটি কনক্লুড বা চূড়ান্তভাবে দাখিল সম্পন্ন হলে আমরা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার অবশ্যই করব। এই মামলার স্বার্থে যা যা করা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় এবং সুষ্ঠু তদন্তের জন্য যা করা দরকার, আমরা ঠিক তাই করব।”
এর আগে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার মূল খসড়া অভিযোগপত্রে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ৯ জন কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ পায় সিআইডি। দীর্ঘ এক দশকের নিবিড় তদন্ত শেষে প্রস্তুত করা এই অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চরম দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা, ব্যাংকের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মারাত্মক ঘাটতি রাখা এবং এই নজিরবিহীন অপরাধের ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার বিষয়গুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সিআইডি ডিজিটাল রেকর্ড সূত্রে জানা গেছে।
সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্রটি আরও নিশ্চিত করেছে যে, এই রিজার্ভ চুরি মামলায় দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে বাংলাদেশের মোট ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধের অকাট্য ও সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও অন্য যাদের নাম এই তালিকায় এসেছে তারা হলেন—কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, মেজবাউল হক এবং আবুল কাসেমসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে অভিযুক্ত হওয়া এই ১০টি নামের মধ্যে ৯ জনই স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা।
মূল ঘটনার বিবরণে তদন্ত সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সুরক্ষিত থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা বিশাল অঙ্কের টাকা) হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের মাধ্যম ‘সুইফট পেমেন্ট’ ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল বার্তা পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক অজ্ঞাতনামা হ্যাকার চক্র এই বিপুল অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে নেয়। বিশ্ব কাঁপানো এই ঘটনার দীর্ঘ ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়। মামলার শুরু থেকেই এর তদন্তভার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিচালনা করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্তে নিয়োজিত সিআইডির বিশেষ দল জানায়, ঘটনার দিন সুইফট সিস্টেমের সর্বোচ্চ সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিকর ফিশিং লিংক থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অপরাধটি ঘটে যাওয়ার পর দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতির অকাট্য তথ্য মিলেছে। পাশাপাশি তদন্তে আরও নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে যে, ঘটনার পর বিষয়টি ব্যাংকের ভেতরে জানাজানি হওয়ার পরও যথাযথ বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণে রহস্যজনকভাবে দীর্ঘ বিলম্ব করা হয়েছিল।
তদন্তের নথিসূত্রে জানা যায়, মামলার মূল তদন্তে দেখা গেছে বাংলাদেশের এই ১০ জন অভিযুক্ত আসামি সরাসরি এ ঘটনায় তাদের মারাত্মক গাফিলতি ও দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ রেখে গেছেন। এছাড়া তারা সম্পূর্ণ অজানা ও রহস্যময় কারণে ঘটনার দিন সুইফট সিস্টেমের সাইবার নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করেননি। প্রতিদিনের ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষে তারা হ্যাকারদের পাঠানো ছদ্মবেশী ফিশিং লিংকে ক্লিক করে কম্পিউটার সিস্টেমটি ওপেন বা সচল রেখেই ব্যাংক ভবন থেকে বের হয়ে চলে যান। তারা কেন্দ্রীয় সিস্টেমের যথাযথ নিরাপত্তা লক নিশ্চিত না করে বের হয়ে যাওয়ায় হ্যাকাররা সেই সুযোগটি নেয় এবং ওই উন্মুক্ত লিংক ব্যবহার করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা সুকৌশলে চুরি করে নিয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, ঘটনার পর অভিযুক্তরা বিষয়টি পুরোপুরি জানতে পারলেও পরবর্তীতে টাকা উদ্ধার বা হ্যাকিং ঠেকানোর কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। উল্টো তারা এই বিশাল আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নানামুখী অপচেষ্টা ও তদবির চালিয়েছিলেন। এছাড়া দীর্ঘ সিআইডি তদন্তে রিজার্ভ চুরির এই সুগভীর ষড়যন্ত্রে তাদের আরও প্রত্যক্ষ ডিজিটাল সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া গেছে।
সিআইডি সূত্র আরও জানায়, রিজার্ভ চুরির এই দীর্ঘদিনের ফাইলটি গতি পায় যখন গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের শক্তিশালী উচ্চপর্যায়ের 'পর্যালোচনা কমিটি' গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। মূলত ওই বিশেষ কমিটির কঠোর তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনাতেই থমকে থাকা রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। এরপর গত ১ এপ্রিল সিআইডির পক্ষ থেকে এই মামলার খসড়া অভিযোগপত্রটি প্রস্তুত করে চূড়ান্ত আইনি পরামর্শের জন্য দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। খসড়া এই আন্তর্জাতিক চার্জশিটে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম সুনির্দিষ্ট করা রয়েছে। সিআইডির দেওয়া বৈশ্বিক তালিকা অনুযায়ী, এর মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬ জন, উত্তর কোরিয়ার ২ জন, চীনের ৩ জন, শ্রীলঙ্কার ৮ জন, জাপানের ১ জন, ভারতের ৪ জন এবং বাংলাদেশের সর্বমোট ১০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির এই ঘটনাটি যখন প্রথম প্রকাশ্যে আসে, তখন তা পুরো বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। দেশের ইতিহাসের অন্যতম এই বৃহত্তম ও নজিরবিহীন আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি গভীর সংশ্লিষ্টতা, অর্থপাচারের আন্তর্জাতিক রুট এবং উচ্চ প্রযুক্তির সাইবার বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখতেই সিআইডিকে এই দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তদন্ত কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।