সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 132
রেজাউল করিম ঝন্টু , সিরাজগঞ্জ
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পরাজিত করে আত্মনির্ভরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌরসভার ভাদাশ পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা রেজাউল করিম রেজা। জন্মগত প্রতিবন্ধকতা তার চলাফেরাকে সীমিত করলেও জীবনসংগ্রামে তিনি কখনো থেমে যাননি। পরিশ্রম, আত্মসম্মানবোধ ও দৃঢ় মনোবলকে সঙ্গী করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের ছোট্ট জীবিকা।
তাড়াশ পৌরসভার উত্তর বাঁধ এলাকায় একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করেন তিন সন্তানের জনক রেজাউল করিম রেজা। প্রতিদিন ভোর থেকেই শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। পুরোনো একটি হাতচালিত হুইলচেয়ারে করে তিনি বাড়ি থেকে দোকানে যান। ভাঙাচোরা রাস্তা, উঁচুনিচু পথ কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।
দোকানে পৌঁছে তিনি নিজ হাতে চা প্রস্তুত করেন, ক্রেতাদের সেবা দেন এবং দোকানের হিসাবও নিজেই দেখাশোনা করেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তার কর্মনিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস স্থানীয়দের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, রেজাউল করিম রেজা কেবল একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নন, তিনি আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতার জীবন্ত প্রতীক। আর্থিক সংকট কিংবা শারীরিক অসুবিধা তাকে কখনোই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল করেনি। বরং নিজের শ্রমকে তিনি জীবনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
নিয়মিত দোকানে আসা ক্রেতারা বলেন, তিনি সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন এবং আন্তরিকভাবে সেবা দেন। ব্যক্তিগত কষ্ট বা সমস্যার কথা খুব কমই প্রকাশ করেন। তার ব্যবহারের আন্তরিকতা ও সততা এলাকার মানুষের মধ্যে তাকে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
রেজাউল করিম রেজা বলেন, তিনি কখনোই কারও দয়া বা করুণার ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে চাননি। নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমেই পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে চান। তার একমাত্র স্বপ্ন, সন্তানদের ভালোভাবে শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তারা ভবিষ্যতে তার মতো কষ্টের জীবন না পায়।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি যে হাতচালিত হুইলচেয়ার ব্যবহার করছেন, সেটি পুরোনো ও প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে গিয়ে তাকে প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা ও গরম মৌসুমে এই যাতায়াত তার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে, যা তার ব্যবসাতেও প্রভাব ফেলে।
স্থানীয়দের মতে, রেজাউল করিমের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার। এটি পেলে তার যাতায়াত সহজ হবে, শারীরিক কষ্ট কমবে এবং তিনি আরও বেশি সময় দোকানে দিতে পারবেন। এতে পরিবারের আয়ও কিছুটা বৃদ্ধি পাবে বলে তারা মনে করেন।
এলাকার সচেতন মহল মনে করেন, সমাজের অনেক মানুষ সামান্য সহযোগিতা পেলেই নিজেদের জীবনকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। রেজাউল করিম রেজাও তেমনই একজন, যার পাশে দাঁড়ানো হলে তার জীবন আরও সহজ ও সম্মানজনক হতে পারে।
স্থানীয়রা বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, মানবিক সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতি তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, একজন পরিশ্রমী ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষকে সহায়তা করা মানে একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়তা শুধু দান নয়, বরং তাদের চলাচল, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার সুযোগ নিশ্চিত করাই প্রকৃত মানবিক উদ্যোগ। রেজাউল করিমের জীবন সেই বাস্তবতারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।