আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি:
আমার হারানোর আর কিছু নেই, পাওয়ারও কিছু নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি শুধু চরম সত্যটা লিখে যেতে চাই। দুর্নীতি ধরার কারণে সাবেক সরকারের আমলে আমি আর্থিক, শারীরিক ও সামাজিকভাবে চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছি। পরিবার নিয়ে রাস্তায় বসতে হয়েছে, সমাজ থেকে কোণঠাসা করা হয়েছে। চাকরি, ব্যবসা, সম্মান—সব হারিয়েছি শুধু সত্য বলার কারণে। সেই নির্মম নির্যাতনের পর থেকেই আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক জিহাদ ঘোষণা করেছি। যতদিন বেঁচে আছি, এই লড়াই থামবে না, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে আমার কলম চলবে অবিরাম।
এ দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে এবং টেকসই উন্নয়নের প্রধান দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বাধা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। আর এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে সরকারি আমলাতন্ত্রের একটি নীতিহীন ও লোভী অংশ। আমি মাত্র এক বছর ধরে মূলধারার সাংবাদিকতা ও অ্যান্টি-করাপশন আন্দোলনের কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছি। এই অত্যন্ত অল্প সময়েই আমি যে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের ভয়াবহ মডেলটা বারবার প্রত্যক্ষ করেছি, তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বড় বাজেটের মেগা প্রকল্পগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কাগজে-কলমে পাস করানো হয়। কিন্তু যখন বাস্তবায়নের মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়, তখন সেখানে দেখা যায় কেবল নামমাত্র ও লোকদেখানো কার্যক্রম। প্রকল্পের সিংহভাগ টাকাই নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়।
প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা পায় তাদের পূর্বনির্ধারিত বড় অংশ, আর ফাইলের অনুমোদন ও বিল ছাড় করার দায়িত্বে থাকা দুর্নীতিবাজ আমলারা পকেটে পোরে মোটা অঙ্কের ‘কমিশন’। এর চূড়ান্ত ও নির্মম ফলাফল দাঁড়ায় এই যে, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে জনগণের করের পুরো টাকাটাই নিখুঁতভাবে বেরিয়ে যায়, কিন্তু সাধারণ জনগণ দিনশেষে পায় চরম নিম্নমানের সেবা এবং ভঙ্গুর অবকাঠামো। এটাই হলো প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় লুট। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে ঘুষ দিয়ে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সম্পূর্ণ হজম করে ফেলার এই কুৎসিত উৎসব আমি নিজে দেখেছি। এই সর্বনাশা লুটপাটের অপসংস্কৃতি যদি অনতিবিলম্বে কঠোর হস্তে বন্ধ করা না যায়, তবে বাংলাদেশ কখনোই একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
আমার সাবেক কর্মস্থল বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে আমি সরাসরি যুক্ত থাকাকালীন সেখানে চলমান নানামুখী অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, যারা অতীতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি করেছে এবং বর্তমানেও বুক ফুলিয়ে করে চলেছে, তারা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত হচ্ছে। তারা প্রতিনিয়ত উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাচ্ছে এবং অবৈধ উপায়ে রাতারাতি আর্থিকভাবে বিপুল সচ্ছলতা লাভ করছে। পক্ষান্তরে, সত্যের পক্ষে লড়াই করার কারণে আমি নিজে ভয়াবহভাবে নির্যাতিত হয়েছি, পদে পদে নিষ্পেষিত হয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছি। এই সংস্থায় যেন সব ধরনের শুদ্ধাচার ও নীতির এক সম্পূর্ণ উল্টো খেলা চলছে। যারা সুনির্দিষ্টভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল, তারা এখন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সম্মানিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পদে বহাল তবিয়তে আসন গ্রহণ করছে। তাদের দুর্নীতির ফাইল কখনো কোনো টেবিলে আটকে থাকে না, তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় তদন্ত আলোর মুখ দেখে না।
আর অন্যদিকে যারা এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, অকাট্য প্রমাণ হাতে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে, তাদের ভাগ্যে জুটেছে সীমাহীন নির্যাতন, সামাজিক অপমান ও পরিকল্পিত কোণঠাসাকরণ। সৎ কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে দূরবর্তী স্থানে বদলি করা হয়েছে, নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানি করা হয়েছে এবং চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত বা সরানোর অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। এই চরম বৈষম্যমূলক ও উল্টো চিত্রের কারণেই বর্তমানে বহু সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা নিজেদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানে মেধা, সততা ও নৈতিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছে চাটুকারিতা, লবিং ও অবৈধ কমিশন বাণিজ্য। এর ফলে পুরো প্রতিষ্ঠানটি আজ প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা, যাদের কল্যাণের জন্য এই ট্রাস্ট গঠিত হয়েছিল—অর্থাৎ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের অসহায় পরিবারবর্গ।
আমি নিজে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এবং বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ করে একটি সুনির্দিষ্ট অশুভ ত্রিমুখী যোগসূত্র বা ক্ষমতার ত্রিভুজ দেখতে পেয়েছি। প্রথমত, ফাইলের একচ্ছত্র ক্ষমতা। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা কেবল ওপরের স্তরের নীতি বা নির্দেশনা প্রণয়ন করেন। কিন্তু একটি প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি যেমন—ডিটেইলড প্রজেক্ট প্ল্যান (ডিপিপি), টেন্ডার বা দরপত্রের জটিল শর্তাবলি, এবং কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন—এই সমস্ত প্রযুক্তিগত বিষয় সাধারণ মানুষের বোঝার বাইরে থাকে এবং তা নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকে আমলাদের হাতে। এই টেকনিক্যাল জ্ঞানের চরম অসমতাই মূলত দুর্নীতির প্রথম ও প্রধান গোপন দরজা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়ত, সৎ মানুষের নির্মম শাস্তি। যে কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাষ্ট্রীয় নিয়ম-কানুন অক্ষরে অক্ষরে মেনে দেশের স্বার্থে কাজ করতে চান এবং কোনো ত্রুটিপূর্ণ বা দুর্নীতির ফাইল আটকে দেন, তাকে সাথে সাথে প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়তে হয়। তাকে হয়রানিমূলক বদলি, চাকরিগত পদাবনতি ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার সব ধরনের চক্রান্তের মুখোমুখি হতে হয়, যার জ্বলন্ত প্রমাণ আমি নিজে। সততা বজায় রাখার চরম মাশুল আমাকে দিতে হয়েছে আমার জীবনের সর্বস্ব এবং শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় কর্মচারী ছাড়া এই বিশাল লুটপাট কোনোভাবেই সম্ভব না। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, তিনি একা কখনোই রাষ্ট্রের টাকা তুলে নিতে পারেন না। সরকারি কোষাগার থেকে টাকা ছাড় করতে হলে, প্রতিটি বিল পাস করাতে হলে এবং নিরীক্ষা বা অডিট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে হলে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বলি—সরকারি কর্মচারী ও আমলাতান্ত্রিক পর্যায় থেকে যদি দুর্নীতি উপড়ে ফেলা না যায়, তবে কোনো অবস্থাতেই এ দেশ সামনের দিকে আগাবে না।
দুর্নীতির কারণে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি প্রতিদিন কী বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সম্ভাবনা হারাচ্ছে, তার একটি বাস্তবসম্মত হিসাব তুলে ধরা জরুরি। প্রথমত, সরাসরি আর্থিক ক্ষতি। ওভার-ইনভয়েসিং বা আমদানিতে কৃত্রিমভাবে মূল্য বাড়িয়ে দেখানো, ভুয়া ও জাল বিল তৈরি, এবং অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণকাজের মাধ্যমে প্রতি বছর রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সরাসরি লুটপাট ও বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি। এই যে বিপুল পরিমাণ টাকা প্রতি বছর আমলা ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট লুটে নিচ্ছে, এই টাকা যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে থাকত, তবে দেশে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিশ্বমানের হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সারা দেশের কাঁচাবাজারের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় ও শক্তিশালী বাজার মনিটরিং সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হতো। তৃতীয়ত, আগামী প্রজন্মের অপূরণীয় ক্ষতি। জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ টাকা যখন এভাবে দুর্নীতির পেটে চলে যায়, তখন শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসা খাতের মতো মৌলিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমে আসে, যার ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ সন্তানরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসের চরম ক্ষতি। একজন সাধারণ নাগরিক যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত দেখে যে, নিয়ম মেনে সততার সাথে চললে কেবল বিপদ আর হয়রানি পোহাতে হয়, অন্যদিকে নিয়ম ভেঙে দুর্নীতি করলে মেলে রাষ্ট্রীয় पुरस्कार ও সামাজিক মর্যাদা—তখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা ও शासन কাঠামোর ওপর থেকে সাধারণ মানুষের শেষ আস্থা ও বিশ্বাসটুকু সম্পূর্ণভাবে উঠে যায়।
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমি সরকারের নিকট সুনির্দিষ্ট ১০ দফা সংস্কারের দাবি উপস্থাপন করছি। ১. ফাইল হবে সম্পূর্ণ ওপেন: ১ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের প্রতিটি সরকারি ফাইলের ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। একটি ফাইল কোন কর্মকর্তার টেবিলে কতক্ষণ আটকালো, কেন আটকালো এবং কত দিনে ছাড় হলো, তা দেশের সাধারণ জনগণ তাদের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি লাইভ দেখতে পাবে। ২. বদলি ও পদোন্নতি হবে কেবল মেধা ও সততায়: সরকারি চাকরিতে সব ধরনের রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক বদলি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কর্মকর্তাদের সততা, বার্ষিক কার্যসম্পাদন, নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সামগ্রিক কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. হুইসেলব্লোয়ার বা তথ্যদাতার আইনি সুরক্ষা: আমি ব্যক্তিগতভাবে যে ধরনের অমানুষিক নির্যাতন ও সামাজিক হয়রানির শিকার হয়েছি, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সত্যবাদী নাগরিককে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্য তথ্যদাতার জীবন, চাকরি ও তার পরিবারের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কঠোর 'হুইসেলব্লোয়ার প্রটেকশন অ্যাক্ট' বা তথ্যদাতা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. মেগা প্রকল্প হবে লাইভ সম্প্রচার: ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের প্রতিটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মোট বাজেট, নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, অন্তর্বর্তীকালীন বিলের বিবরণ এবং বাস্তব অগ্রগতি একটি উন্মুক্ত ওয়েব পোর্টালে প্রকাশ করতে হবে, যেখানে ড্রোন ফুটেজের মাধ্যমে কাজের বাস্তব চিত্র প্রতিনিয়ত লাইভ আপডেট করা হবে।
৫. শতভাগ ই-টেন্ডার বাস্তবায়ন: দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে মানুষের সব ধরনের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ সরিয়ে দিতে হবে। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও নিরপেক্ষ মেশিন লটারির মাধ্যমে যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
৬. বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার: সরকারি খাতের যে কোনো দুর্নীতির মামলা সর্বোচ্চ ১ বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য বিশেষ জুডিশিয়াল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামির সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তাকে আজীবন সরকারি যে কোনো কাজে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
৭. সৎ কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন: যে কর্মকর্তা সাহসিকতার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও বড় ধরনের অনিয়ম ধরে দেবেন, তাকে রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মাননা, দ্রুততর পদোন্নতি এবং এককালীন আর্থিক পুরস্কারে ভূষিত করতে হবে।
৮. বার্ষিক সম্পদের বাধ্যতামূলক অনলাইন হিসাব: গ্রেড-১০ থেকে শুরু করে ওপরের স্তরের সমস্ত সরকারি কর্মকর্তার বার্ষিক সম্পদের বিবরণী প্রতি বছর অনলাইনে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। আয়ের উৎসের সাথে সম্পদের সামান্যতম অসঙ্গতি পাওয়া গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত শুরু হতে হবে।
৯. নাগরিক অ্যাকশন গ্রিড: কোনো নাগরিক সরকারের নির্দিষ্ট হটলাইনে বা ৩ নম্বরে কোনো অনিয়মের অভিযোগ dায়ের করলে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাঠ পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক অ্যাকশন নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সেই অ্যাকশনের চূড়ান্ত ফলাফল সংশ্লিষ্ট নাগরিককে এসএমএসের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে হবে।
১০. বাধ্যতামূলক নৈতিকতার পাঠ: সরকারি চাকরিতে চূড়ান্তভাবে যোগদানের পূর্বে প্রত্যেক নবীন কর্মকর্তার জন্য ন্যূনতম ১ মাস মেয়াদি অত্যন্ত কঠোর "পাবলিক সার্ভিস এথিক্স" বা সরকারি সেবা নৈতিকতা কোর্স সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এই কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তার নিয়োগ সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে।
আমি নিজে সামাজিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছি, আমার সর্বস্ব হারিয়েছি, তবুও আমার কলম ও সত্যের আওয়াজকে কেউ স্তব্ধ করতে পারেনি। কারণ আমি নিজের চোখে দেখেছি, এ দেশের কোটি মানুষের স্বপ্নের প্রজেক্টগুলো কীভাবে স্রেফ শীদার হিসেবে বহাল থাকবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো মেগা প্রকল্প, কোনো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ কিংবা কোনো চটকদার উন্নয়নের গল্প এ দেশের সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষের পেট ভরাতে পারবে না। আমি আব্দুল কাইয়ুম খান, আমার হারানোর আর কোনো ভয় নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতিত হওয়ার পর যে পবিত্র জিহাদ আমি শুরু করেছি, তা আমার শরীরের শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
আমি বর্তমান ও নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়ের বিশেষ অবগতি ও জরুরি সতর্কতার জন্য আমার অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কিছু ভয়াবহ অনিয়মের সুনির্দিষ্ট চিত্র এখানে সংযুক্ত করছি। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের বিভিন্ন লাভজনক প্রতিষ্ঠান ইজারা বা লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় অবৈধ সুবিধাভোগী ও লাভবান ব্যক্তি হলেন ফয়েজ আহমেদ খান। বিশ্বস্ত সূত্রে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে পেরেছি যে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফয়েজ আহমেদ খানের একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় তাঁর নিজের ও বেয়াইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ বেনামী সম্পত্তি গড়ে তোলা হয়েছে। এই ট্রাস্টের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইফতেখারুল ইসলাম খান (পরিচিতি নাম্বার: ৪০১৯, সাবেক অতিরিক্ত সচিব), তাঁর প্রত্যক্ষ মেয়াদে ব্যাপক অনিয়ম চালিয়েছেন।
তিনি এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান এককভাবে পরিচালনা করতেন কল্যাণ বিভাগের আবুল কাশেম চৌধুরী। এই আবুল কাশেম চৌধুরী মূলত মাদ্রাসার শিক্ষায় শিক্ষিত এবং তাঁর সাধারণ ও প্রশাসনিক শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বর্তমানে যথেষ্ট গুরুতর সন্দেহ রয়েছে, যা আমাদের অ্যান্টি করাপশন মুভমেন্টের পক্ষ থেকে গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। এই আবুল কাশেম চৌধুরীকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে যুগ্মপরিচালক হিসেবে পদোন্নতি ও দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন সাবেক বিদায়ী মাহবুবের রহমান ( ইকোনমিক ক্যাডার) । বিশ্বস্ত সূত্রে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পেরেছি যে, ট্রাস্টের অন্যতম লাভজনক প্রতিষ্ঠান 'পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন' থেকে প্রতি মাসে বিদায়ী মাহবুবের রহমান ( ইকোনমিক ক্যাডার) নগদ ২ লাখ টাকা করে অবৈধ মাসোহারা বা ঘুষ দেওয়া হতো, যা সরবরাহ করত এই সিন্ডিকেট। এর পাশাপাশি ট্রাস্টের কল্যাণ বিভাগ থেকেও প্রতি মাসে সাবেক এমডিকে আরও ৩ লাখ টাকা নগদ পৌঁছে দেওয়া হতো মর্মে নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এছাড়াও, ট্রাস্টের ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদ হোসেন বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় একাধিক আলিশান ফ্ল্যাটের মালিক বনে গেছেন, যা তাঁর আয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। অন্যদিকে, ট্রাস্টের সহকারী প্রধান হিসাবরক্ষক গাজী আবুল হোসেন একজন চরম দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পর্দার আড়াল থেকে এই সম্পূর্ণ আর্থিক অনিয়ম ও ভুয়া বিল পাসের সিন্ডিকেটটি নিখুঁতভাবে রক্ষা করে আসছেন। 'পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন'-এ দীর্ঘ দিন ধরে পাম্প অপারেটর হিসেবে কর্মরত বোরহান বেপারী প্রতি ১০ লিটার জ্বালানি তেলের বিপরীতে ওজনে ১ লিটার করে তেল কম দিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সাথে প্রতারণা করে আসছে। এই বিষয়ে ইতিপূর্বে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে সে বহাল তবিয়তে রয়েছে।
বিশেষ কায়দায় কারচুপি করে দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে বোরহান বেপারী কেরানীগঞ্জে সুবিশাল বহুতল বাড়ি নির্মাণ করেছে এবং তার দুই ছেলেকে বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশে পাঠিয়েছে। এই সমস্ত চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, জালিয়াত ও সিন্ডিকেটধারী কর্মকর্তাদের নানামুখী চক্রান্ত থেকে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়কে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সাবধানে থাকার জন্য আমি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
আকাশজমিন / আরআর
আকাশজমিন / আরআর